অপ্রাকৃতিক প্রকৃতি

ড. মুকিদ চৌধুরী
ড. মুকিদ চৌধুরী 330 Views

স্মৃতি              একজন সন্তানহীন মা

রুপাই            স্মৃতির স্বামী

মানব             স্মৃতির প্রতি তার আকর্ষণ গভীর

অলক             রূপাইয়ের ছোট ভাই

পদ্মশ্রী             অলকের স্ত্রী

অণিমা            একজন প্রতিবেশি

সাধুবাবা          একজন কবিরাজ


রেলগাড়িটি এসে থামল স্টেশনে। হকারের ডাক, পানওয়ালা, সিগারেটওয়ালার ভিড়, ভিক্ষুকের ঠেলাঠেলি। রুপাই এই ঠেলাঠেলির মধ্য দিয়েই বাজারের থলেটি নিয়ে বাজার শেষ করে বিস্ময় মেশানো উদ্বেগ নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। তার মুখ ভীষণ থমথমে। মসৃণ গণ্ডদেশ। খুবই চিন্তিত সে। আঙুল আর আঙুলের গিঁঠগুলো শক্তসবল। ভুরু, চোখ উভয়ই পৌরুষদীপ্ত। সৌকুমার্যের উদয় চিরস্থির। তবুও এই মুহূর্তে ভুরু আর চোখ যেন সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে এমনই আলিঙ্গনে আবদ্ধ। ভুরু ও চোখের নিচে যেন যন্ত্রণা ঝরতে থাকে- না ঝরে উপায় নেই; তবু রুপাইকে বাজারের থলি নিয়ে পথ ভাঙতে হচ্ছে; আর আত্মনিপীড়ন যত নিষ্ঠুরই হোক না কেন, কোনো-এক বিকৃত উপায়ে অন্তর নিংড়ানো উৎকট উপভোগ তার দুই পায়ের পাতা দিয়ে যেন জলের মতো বেয়ে পড়ছে। কত উৎকট তা বুঝতে পেরে রুপাইয়ের যে হাতটি বাজারের থলি ধরে নেই; সেই হাত থেকে মাঝেমধ্যে অশান্ত দীর্ঘশ্বাস পড়ছে; যদি কখনো প্রশান্ত বিরতি ঘটছে না! কিন্তু দেরি হয়ে গেছে বাজারে আসতে; বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে; এখন আর আক্ষেপ করে কোনো লাভ নেই।

সকালবেলায় রুপাই যখন বাজারে চলে যায়, তখন স্মৃতি নিজেকে ভীষণ একা লাগছিল। এই নিঃসঙ্গতা সে ভয় পায়। এ-যেন তার কাছে একটা ভীষণ আতঙ্ক: যদি কখনো তাকে সত্যি সত্যি একা থাকতে হয়নি; বাড়িতে তার দেবর ও দেবরের স্ত্রী আছে। কেউ-না-কেউ তার সঙ্গে বাড়িতে থাকে; তবুও সে মাঝেমধ্যে মনে করে জীবনটা এমনি-যে অনেক সময় কাছের মানুষটিকেও পাওয়া যায় না। আর যদি-বা পাওয়া যায়, ঠিক সময় হয়তো তখন নয়। তবুও তো রুপাইকে পাওয়ার আশা নিয়েই সে বেঁচে থাকে। রুপাইকে খুঁজে। রুপাইকে ভালোবাসে। রুপাই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, পূর্ণতার অংশ।

রুপাইকে না পাওয়ার বিষণ্ণতা কাটানোর জন্যই স্মৃতি নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখতে চাইল। যে-কাজ স্মৃতিকে কিছুই ভাবার সময় দেয় না। নয়তো সে বাঁচবে কী করে? কী করে সহ্য করবে তার নিঃসঙ্গতা- শূন্যতার অর্থহীনতার কিংবা অর্থহীন শূন্যতা। একটি সহজ, সরস- নিজের ইচ্ছায় সঞ্চিত, আনন্দে উদ্দীপ্ত। সেই কাজে কোনো ভার নেই, দায়ও নেই। পাখি যেমন করে নিজের ইচ্ছেমতো সুর ভাঙে, সেইভাবেই নিটোল হৃদয়ের মধ্যে নিজেকে আবার সৃষ্টি করতে চায়- রূপান্তরিত, বিশুদ্ধ রসের প্রেরণায়। অন্যটি সংকীর্ণ কিংবা প্রতিদিনের- বিরাট, দুর্বোধ্য অর্থনৈতিক পদ্ধতি; লোকসান কিংবা ধনবৃদ্ধি কিংবা মাত্রাহীন, ছন্দহীন ধনস্ফীতির কর্ম। এই কাজ অন্যের জন্য, নিছক জীবিকার জন্য, তাই যান্ত্রিক অসাড়। কারণ মনের একরকম অসুস্থতা, বিকৃতি ছাড়া এ আর কিছুই নয়। শুধুই ক্লান্তি বাড়ে। স্মৃতি দ্বিতীয় কর্মটিকে পরিত্যাগ করে প্রথমটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্নান সেরে ঘরে এসে একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে থাকে।

তখনই সিঁড়ি ভেঙে প্রশস্ত চৌকোণ কাঠের জাফরি ঘেরা বারান্দায় স্মৃতির ঘরে প্রবেশের খোলা দরজায় সম্মুখে এসে দাঁড়াল মানব। মধুর একটি গন্ধ- দামি সাবানের উৎকৃষ্ঠ ঘ্রাণ তার নাকে এসে লাগল। মানব আরও দুই পা অগ্রসর হলো, অনুমান করল, সকালে কৌরকার্য সমাধা করে রুপাই হয়তো ঘরে এসেছে। মানব দেখল, দীর্ঘ কেশদামে পৃষ্ঠদেশ আবৃত- ধৌত চুলে চিরুনি লাগিয়ে স্মৃতি মাথা কাত করে চিরুনি টানছে। দাঁড়িয়েছে দরজার দিকে পেছন ফিরে। এবং দর্পণের পটভূমিকায় তার সর্বাঙ্গের ছায়া প্রতিবিম্বত হয়েছে। যা দেখার ছিল না সে যেন তাই দেখেছে, সন্দেহ নেই। মূঢ়তার বশে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ যেন সে করে ফেলেছে।

মানরক্ষার্থে সে আর এখানে দাঁড়াল না। কোনো শব্দও উচ্চারণ করল। শুধু এই দৃশ্যটি তার হৃৎপিণ্ডে অনুভূত হতে লাগল। খোলা বারান্দার সিঁড়ি ভেঙে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে উধাও হয়ে গেল। ঘামে তার সর্বাঙ্গ ভিজে গিয়েছে। মাথার ভেতর কেমন একটা অসারতা না যন্ত্রণা না ঘূর্ণণ উপলব্ধি হচ্ছে। এবং মস্তিষ্কের এই অবর্ণনীয় অবস্থার কারণে তার চিন্তাশক্তি, এবং নিজেকে হৃদয়ঙ্গম করার সম্বিৎ লোপ পেয়ে গেছে।

রুপাইয়ের বাড়ির সামনের বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা শাকসব্জির বাগানের ধারে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তখনই চোখ পড়ল রাশি রাশি কুমড়োর ফুল- হলুদ রং- হলুদ আর হলুদ। সকালে রোদ্দ ঠিকরে পড়েছে তাদের ওপর। তার হঠাৎ মনে হলো, কে বলে কুমড়ো ফুলের শোভা নেই, সৌন্দর্য নেই। কি এক অপূর্ব সৌন্দর্যে ওর মনের ভেতরটা ভরে গেল। পবিত্র লাগল।

রুপাই তার পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল। তারপর হো হো করে হেসে বলল, কুমড়োর ফুল দেখেই যদি এতটা মুগ্ধ হও তাহলে বারান্দার পাশে নয়নতারা দেখলে তোমার কি অবস্থা হবে তা ভেবে পাই না।

বাগানটা দিব্যি ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন। উঁকিঝুঁকি মারছে কয়েকটি লঙ্কা গাছও। তরমুজের লতায় ছোটো একটি তরমুজও দেখতে পাচ্ছি।

তুমি ফিরে এসেছ বলে খুশি হয়েছি। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ? ভেতর বাড়িতে গিলেই পারতে।

মানবের শুষ্ক কণ্ঠ এবং শুষ্ক জিহ্বা আরও আড়ষ্ট হয়ে গেল- ঠোঁটের ফাঁকে শব্দের পরিবর্তে শুধু বায়ু বেরুতে লাগল।

স্মৃতি ও পদ্মশ্রী তো বাড়িতে আছে।

মানব একটু গলা পরিষ্কার করে বাক্শক্তি সামান্য কার্যকর হলে সে উচ্চারণ করল, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। জানি তুমি বাজার সেরে এখনই আসবে?

আর বলো না, বাজার! আজকাল আর বাজার করতে ভালো লাগে না। আর কথা নয়, চলো, ভেতরে গিয়ে আলাপ করা যাবে।

রুপাইয়ের আহ্বানে মানবের কণ্ঠাগত প্রাণ বোঁ করে ওষ্ঠাগত হলো; তার আর রুপাইয়ের মাঝখানে আর কোনো অন্তরাল আর থাকল না- যখন রুপাই তার বৃহৎ শরীর নিয়ে মানবের কাঁধ ঝাঁপটে ধরল। আড়ষ্ট মানব কষ্টে একটা ঢোক গিলল। ভেতর বাড়িতে পৌঁছতেই মানব দেখতে পেল, জাফরির পাশ থেকে সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছে স্মৃতি। দেখে মনে হলো, সে যেন অথিতির জন্য অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছে। অথচ মুখে অতিথি আপ্যায়নের হাসি নয়। এই হাসি যেন কোনো সময়েই ওই মুখকে ছেড়ে যায় না।

খুব সাদামাটা শাড়ি পরতেই স্মৃতি অভ্যস্ত। তবুও সে আজ স্নান করে একটা ভালো শাড়ি পরেছে। কিংবা স্মৃতিকে ভালো মানিয়েছে বলেই শাড়িটা ভালো মনে হচ্ছে। স্মৃতির চেহারাতেও বেশ একটা আলগা শ্রী আছে। মুখের সপ্রতিভ ভাবটার জন্যও হয়তো ভালো লাগছে। ঠোঁটদুটি রমণীসুলভ সরস ও লাবণ্যযুক্ত। এই অবস্থায় স্মৃতিকে কেউ দেখলে তাকে পছন্দ না করে সম্ভব নয়।

রুপাইয়ের নির্দেশ মতো মানব একটা চেয়ারে বসেছে তার শোবার ঘরেই। বসার ঘর বলে কোনো আলাদা কিছু নেই। জানালার পরদা আর বিছানার চাদরে চোখ পড়তেই মানব বলে ফেলল, বাঃ, বেশ সুন্দর তো।

ঘরের সামনে নয়নতারা ফুলের মতোই জানালার পরদা আর বিছানার চাদরে এক অচেনা জগতের স্পর্শ পেল মানব। মনটা তার খুশি হয়ে উঠল।

স্মৃতি একটা কাঠের টুল এনে রাখল চেয়ারের সামনে। স্মৃতি ঘাড় ঘুরোতে রুপাইয়ের যন্ত্রণাকাতর ভঙ্গি তাকে বিস্মিত করল। কছু বলার আগে সে মনে মনে কথা গুছিয়ে নিল; দু-চারটে সম্ভাবনা মাথায় ঘুরছিল তার। অভ্যাসবশত আঁচলে শরীর ঢেকে বাজারের থলটি হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। কি হয়েছে তোমার? অত্যন্ত মৃদুভাবে শুধাল স্মৃতি।

রুপাই কয়েক মুহূর্ত কী যেন কী ভেবে নিয়ে বলল, আমি আর বাজারে যাব না। আগামীকাল থেকে অলক যেন বাজারে যায়।

এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে স্মৃতি একটু থমকে ঢোক গিলল। বাজার করার ব্যাপারে সুনাম রয়েছে রুপাইয়ের। সে অল্প হলেও আজ ক্ষুণ্ণ। রুপাই ক্ষুণ্ণ কারণ সে দেরি করে বাজারে এসে দেখতে পেয়েছিল শাকসবজি, মাছতরকারি- সবই তারই মতো ঝিমোচ্ছে। যা-হোক তা-হোক কোনোপ্রকারে বাজার সেরে নেয় সে; কোনো অজুহাত খাড়া করেনি। আর সেই কারণেই হয়তো তার রাগ মুখে প্রকাশ পাচ্ছে। এ তার দোষ, বরং মস্ত অসুবিধেই যেন মনের ভাব সে কোনোভাবেই লুকোতে জানে না।

একটু পরে দুই গ্লাস শরবৎ এনে রেখে রুপাইয়ের উদ্দেশে স্মৃতি বলল, শরবৎটা খেয়ে একটু ঠাণ্ডা হয়ে নাও। মিছিমিছি রাগ করা তোমাকে মানায় না। অলককে যেতে হলে সে যাবে, তুমি বললেই যাবে।

রুপাই বলল, অলক কোথায়? বাইরে বুঝি?

স্মৃতি উত্তর দিলো, হ্যাঁ।

মানব হাত বাড়িয়ে শরবতের গ্লাসটি নিতে নিতে বলল, বিছানা চাদর ও জানালার পরদার ডিজাইনটা খুব সুন্দর।

স্মৃতি হেসে, মানবের দিকে তাকিয়ে বলল, গরিবের ঘর তো ডিজাইন দিয়েই সাজাতে হয়। ডিজাইনের কথা থাক। তার চেয়ে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছ?

কথাটা আগেরটার চেয়ে বেশি ধাক্কা দিলো রুপাইকে। এক মুহূর্তের জন্য তার চিরচেনা স্ত্রীকে অন্য-এক চেহারায় দেখতে পেল সে।

মানব দীপ্তিভঙ্গিতে বলল, সর্বনাশ! আমারই ভুল হয়েছে। তুমি কেমন আছ তা জিজ্ঞেস করা হয়নি।

রুপাই মুখ নামাল। বলল, মনের কথা নাই-বা বললে, শরীরের অবস্থা তোমার কেমন আছে তাই বলো।

স্মৃতি খাটো গলায় বলল, শরীরের অবস্থা তো চোখেই দেখতে পারছ। আমি কী ভুল কিছু বললাম?

মানব বলল, মানুষের শরীর আসলে কিছুই নয়, আসল হচ্ছে মন।

মানবের উদ্দেশে স্মৃতি বলল, তাহলে কী তুমি আমার শরীর ভালো থাক তা চাও না। তোমার বন্ধুর মতোই কি উপহাস করছ? সন্তান না দেওয়ার অক্ষমতায় আমাকে অবহেলা করছ?

রুপাই সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল, তোমার কথার পেছনে যা-তা বিশেষণ লাগাচ্ছ কেন? এরকম কথা তোমার মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়। তোমার মনের শান্তির জন্য বলছি, অবশ্যই আমি তোমাকে ঘৃণা বা উপহাস করি না, বরং মনে করি, তুমি আমার আপন মানুষ, তাই তুমি আমার হৃদয়ে সবসময় বিরাজ করছ। তোমার শরীরের অবস্থা জানার প্রয়োজন কি, মনটাকে যখন স্পষ্ট বুঝি!

খুব সহজ, অত্যন্ত সহজ, কিন্তু অদ্ভুত, অত্যন্ত সহজ ব্যাখ্যা শুনে স্মৃতির মনে গজিয়ে উঠল, চারাগাছ থেকে মস্ত বাঁকা বাঁকা ডালপালা; কেন রুপাই এভাবে কথা বলছে তার সঙ্গে?

একটি গামছা এগিয়ে দিতে দিতে স্মৃতি বলল, ঠিক আছে, তুমি হাতমুখ ধুয়ে এসো। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

তাড়াতাড়ি কেন? রুপাই জানতে চাইল।

স্মৃতি বলল, বা-রে, তোমার বন্ধু এখানে বসে আছে। তাছাড়া আমি ছানার সন্দেশ বানিয়ে রেখেছি, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসে তোমাদের খেতে দেবো। ক্ষেতে কত পরিশ্রম করো, একটু সেবাযত্ন তো…।

স্মৃতির কথা শেষ করতে না দিয়েই রুপাই বলল, পরিশ্রম করি বলেই তো সুস্থ আছি। সহজে ক্লান্তি আসে না।

স্মৃতি গরজে তাকাল রুপাইয়ের দিকে। বলল, ক্লান্তি নেই বলে কী সন্দেশ খেতে ইচ্ছে করে না!

রুপাই বলল, এখন খিদে নেই।

স্মৃতি বিস্ময়ে বিহŸল। হতাশার সুরে বলল, হু!

স্মৃতির উৎসুক হৃদয় রুপাইয়ের দৃষ্টিতে আবদ্ধ হলো। একসঙ্গে বাস কয়েক বছর করার পর ¯^ামী-স্ত্রী কতটুকু জানে পরস্পরের কথা? একবন্ধুর সবকথা কী অন্যবন্ধু জানে? কিংবা জানতে পারে? কোনো-এক… কোনো-এক… সত্যি কি আছে? তবুও স্মৃতির এই হু শব্দটি যেন রুপাইয়ের হৃৎপিণ্ডে বিঁধল।

রুপাইয়ের হঠাৎ মনে হলো বড়ো বেশি নিজেদের কথা পরের কানে দেওয়া হচ্ছে। তাই বলল, রাগ হলো বুঝি? ঠিক আছে, হাতমুখ ধুয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি।

স্মৃতি বিরক্ত হয়ে বলল, খিদে না থাকলে খেতে নেই।

রুপাই বলল, খিদে যেন পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, এতক্ষণ বুঝতে পারেনি।

রুপাইয়ের প্রতিটি শব্দ, বিন্দুজলের মতো সাগ্রহে পান করে।

রুপাই চলে গেল। এবং একা পড়েই মানবের বুক আবার বেজায় ঢিপ ঢিপ করতে লাগল- স্মৃতির অনুকম্পা, শিষ্টতা এবং স্বামীর প্রতি দায়িত্ববোধ যতই ¯স্নিগ্ধ ও শান্তিদায়ক হোক না কেন, স্নিগ্ধতা আর সেই পরিবেশ আর টিকতে পারল না- অপরাধের স্মৃতি সজীব আর স্মৃতির উপস্থিতি সেই মুহূর্তেই নিদারুণ উদবেগজনক হয়ে উঠল। সে এতক্ষণে তার একটা ভুল বুঝতে পারল, নিজের হাতে যথেচ্ছ আর অবিসম্বাদিত শাসনক্ষমতা থাকতে স্মৃতি কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির যথাযথ এবং আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়ে রুপাইর কাছে অকারণে লজ্জা পেতে যাবে কেন! অপরাধিকে দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে- তাই দিতে সে এসেছে। কিন্তু সবই মানবের আগাগোড়া ভুল। মানব যাকে চণ্ডিকা ও দণ্ডদাত্রী মনে করে লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছে আর অনর্গল ঘামছে, স্মৃতি তখন তার অবনত মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। হাসিটুকু মানব দেখতে পেল না; কিন্তু স্মৃতির  স্বর শোনল। সে বলল, সকালে হঠাৎ এমন করে এসে দাঁড়ানো ঠিক হয়নি।

মানব প্রার্থনাবাক্য উচ্চারণ করল, সেজন্য আমি অপরাধী আর অনুতপ্ত। আমাকে ক্ষমা করে দিও।

আমি তখন কেবল স্নান করে এসেছিলাম। হঠাৎ আয়নার ভেতর তোমাকে দেখলাম। তোমার ছায়া পড়ল। মানব তা জানে, মর্মান্তিকভাবেই জানে। স্মৃতি বলে চলল, কিন্তু অমন করে ছুটে পালিয়ে গেলে লজ্জায় না ঘৃণায়?

এ প্রশ্নের উত্তর কি হতে পারে! মানব নিশ্চুপ থাকল। উঠার উপক্রম করল।

স্মৃতি বলল, ঘৃণাই-বা করবে কেন! হয়তো লজ্জা পেয়েছিলে। ও কী! সন্দেশ না খেয়ে যাওয়া হবে না। এখানে বসে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করো।

স্মৃতির আদেশ পালন মাথা পেতে মানব নিজের অজ্ঞাতেই মেনে নিল। তারপর মুখ তুলে তাকাল স্মৃতির দিকে। দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর আগে সে চকিত মুহূর্ত অতিবাহিত করল; সেই একটি মুহূর্তে স্মৃতির সমস্ত মুখমণ্ডল তার দর্শনেন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষীভূত হলো। তার হৃদয়ঙ্গম হলো স্মৃতির মুখের শ্রী উজ্জ্বল রূপ দেখে। তবুও সে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। স্মৃতি বলল, আমার হুকুম মানবে তো?

মানব মাথা কাত করে প্রতিশ্রুতি দিলো যে, সে স্মৃতির হুমুক মানতে রাজি। স্মৃতি খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর বলল, আর পালাবে না। আমাকে আয়নায় যেমন দেখেছ, তেমনি দেখা আমার ভালো লাগে। তুমি নির্বোধ তাই দিশে না পেয়ে পালিয়ে যাও।

পরক্ষণেই স্মৃতির শাড়ির খসখস শব্দ উঠল। সে প্রস্থান করল।

জলখাবার সাজিয়ে- শুধু সন্দেশই নয়, সঙ্গে দুই পেয়ালা চা-ও। রুপাই ফিরে এসে মানবের সঙ্গে নিঃশব্দে জলখাবারে মন দিলো। এই নির্জনতা স্মৃতির কাছে ভালো লাগল না। স্মৃতি তাকিয়ে রইল তার স্বামীর দিকে- যেখানে একগুচ্ছ চুল কানের কাছে কোঁকড়ানো সেইদিকে। একটি ম্লান হাসি কিছুটা স্পষ্ট হলো স্মৃতির চোখে, কিন্তু ঠোঁট পর্যন্ত ছড়াল না, চোখ থেকেই মিলিয়ে গেল চোখের কোণের প্রচ্ছন্ন কোনো বিষাদের ছায়ায়।

স্মৃতি আনন্দ-চাপা হাসি হেসে বলল, খেতে খেতেও তোমরা গল্প করতে পার।

স্মৃতির চোখের ওপর চোখ রেখে রুপাই বলল, কি গল্প করব?

স্মৃতি মাথা নেড়ে বলল, যা খুশি।

মানব চুপ করে শোনে। রুপাই বলল, তুমিই বলো, বরং আমরা জলখাবের মনোযোগ দিই।

যাকে নিয়ে স্মৃতির আঁচলে বাঁধা গৌরববোধ সেই রুপাইয়ের মুখের বর্তমান ভাবটি পছন্দ হলো না, রীতিমতো আপত্তিকরই লাগে; কিন্তু এই ভাবটিই আবার রুপাইয়ের ওপর তার মমতাবোধও বৃদ্ধি করে। তাই হয়তো-বা স্মৃতি গল্প বলতে শুরু করল।

স্মৃতি সলজ্জ হাসি হেসে বলল, জানো, আমি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসি তখন আমার স্বামী ছিল অন্যরকম। কিন্তু আজ সে আর আগের মতো আমার সঙ্গে গল্প করে না। ওকে দেখলে মনে হয়, সে কেমন যেন আনমনা থাকে। মনে হয় সে খুব কষ্টে আছে।

কী কথা এসব? প্রণয়ের এ কী গুণ্ঠিত অথচ অর্থহীন উচ্ছাস! অন্যায়, সমস্তটাই অন্যায়। এই অন্যায় কথাবার্তার প্রতিকার কীভাবে করতে হয় তা রুপাইয়ের জানা নেই, তবুও কিছু-না-কিছু তাকে বলতেই হয়। সে তার মাথা ঈষৎ হেলিয়ে, স্নিগ্ধ চোখে স্মৃতির দিকে তাকাল। তারপর বলল, এ তোমার কল্পনার বাড়াবাড়ি। আমি আগের মতোই আছি। কোনো পরিবর্তন আমার ঘটেনি।

রুপাইয়ের উদ্দেশে স্মৃতি বলল, আমাকে তুমি ভুল বোঝো না লক্ষ্মীটি।

রুপাই বলল, আশ্চর্য করলে আমাকে। আমি কেন তোমাকে ভুল বুঝতে যাব। তবে বাড়িতে একা একা থাকো বলে, উদ্বেগ ও অশান্তিতে কিছুটা কাতর, এই যা।

মুখ উঁচু করে তাকাল রুপাই। তার কাছে মনে হলো, এই জলখাবারের আয়োজন করে স্মৃতি তার বহুদিনের রুদ্ধসঞ্চিত ব্যর্থ কামনাবাসনার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। তবে স্মৃতির কথা শোনার পর, একটু স্তব্ধ হয়ে রইল রুপাই। স্মৃতির ডানহাতের তর্জনীপ্রান্তে আবার জড়াল একগুচ্ছ চুল, যেমন হয়, যখনই সে আনমনে কিছু ভাবে। একটু পরে, চুল ছেড়ে বলতে লাগল, পোড়া কপাল আমার, তুমি যে কী বলো আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। তবে, মাঝেমধ্যে ভাবি- আমি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি তাহলে কে আমার দেখাশোনা করবে?

ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল রুপাইয়ের ঠোঁটে, যেন বেদনার, যেন করুণার। কে শব্দটিতে কী মোহ রয়েছে! উচ্চারণে কী জাদু আছে! ধ্বনিতে, শুধু ধ্বনিতেই শক্তির সঞ্চার! এসব ভাবতে ভাবতেই রুপাই বলল, তুমি ঠিক প্রশ্নই করেছ। কে সে? তা জানা প্রয়োজন। তবে অসুস্থ হওয়াটা ঘটতে দেওয়া উচিত হবে না। দিলে জীবনের সমস্ত সহজ উপভোগ বিষাক্ত বিস্বাদে পরিণত হবে।

স্মৃতি বলল, বিস্বাদে? আচ্ছা বলত, আমি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি তাহলে তুমি কি আমার যত্ন নেবে?

রুপাই হাসল, যেন শিশুর মতো সপ্রতিভ সরল কৌতুকে। একটু পরেই বিস্বাদ শব্দটি বিষাদময় হয়ে তার কানে বাজতে লাগল, যা বিষাদের চকিত পূর্বাভাস যেন, যা গনগনে জ্বলন্ত উনুনে হঠাৎ গভীর কুয়াশা নামার মতো, যা নিবিয়ে দেয় আগুন, বুঝিয়ে দেয় সবই ব্যর্থ, কোনো কিছু বলারই যেন আর স্পৃহা থাকে না। তাই হয়তো-বা রুপাইয়ের মুখে বেদনার ব্যাকুলতা ফুটে উঠল। কিছু একটা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠল তার কণ্ঠ; তবুও বলতে হলো তাকে, নিন্দে করো না আমার। পরনিন্দা মহাপাপ। যত্ন করতে হলে করব বই কি! এ আবার কেমন কথা!

স্মৃতি বলল, আসলেই আমি এরকম আশা করি। তাই আমি যতক্ষণ সুস্থ আছি ততক্ষণ প্রাণভরে তোমার যত্ন নিতে চাই।

স্মৃতির অতি যত্নবান কথা, এই মুহূর্তে রুপাইকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করল। তার কথায় ঈর্ষার ঈষত্তম দংশনও প্রকাশ পেল যেন। সে মনে মনে বলল, আমার ভাবনা এই-যে, তোমার যোগ্য হতে পারিনি। কেমন করেই-বা হব! আমি কি তা জানি! আর প্রকাশ্যে বলল, তপ্ত পাগলামিকে শান্ত করো, তৃপ্ত করো তোমার তৃষিত অন্তরকে। তবে এও সত্য, তুমি আমার সেবা করতে করতে নিজের প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছ, যা আমার চৌদ্দপুরুষের সাধ্যে নেই ঠেকানোর।

স্মৃতি বলল, রাখো তোমার বাঁকা কথা। তুমি তো আমাকে তোমার সেবাই করতেই দাও না।

রুপাই বলল, আমার তো কোনো সমস্যা নেই। আমার অসুখও নেই। সবই তোমার কল্পনা মাত্র। আমি সুস্থসবল একজন মানুষ। কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত। তবে দিন দিন বয়স একটু বাড়ছে, তাই হয়তো-বা তোমার কাছে আমাকে কিছুটা ক্লান্ত মনে হচ্ছে। আর তা তো  স্বাভাবিকই। তাই না!

স্মৃতি বলল, বয়স বাড়ছে বলেই তো সেবার প্রয়োজন! স্বর্গারোহণেও সেবা পাওয়ার লোভে দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে যান যুধিষ্ঠির! রামচন্দ্রও বনবাসে সীতাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। যাক-গে, প্রতি বছর… যুগ যুগ… তুমি আর আমি…।

এইরকম কথায় রুপাই হকচকিয়ে গেল, সে মাথা নিচু করতেই যেন একটা চাবুকের আঘাতে জেগে উঠল, এবং মুখ তুলল। তারপর বলল, হাসছ যে ভীষণ! হাসলে তোমাকে ভারি মিষ্টি দেখায়। শোনো, আমাদের জীবন নিয়ে তোমাকে কিছুই ভাবতে হবে না। এভাবেই জীবন চলে যাক। চিন্তার কি আছে? আমরা কেবল শুধু দুটো প্রাণী, আমাদের কোনো সন্তান নেই, দুশ্চিন্তারও কারণ নেই।

স্মৃতি বলল, ঠিক। একদম ঠিক। আমাদের কোনো সন্তান নেই। কিন্তু আমার মন শক্সখচিলের মতো উড়ে বেড়ায় দূর আকাশে, মরুভূমির মতো ধূধূ করে হৃদয়, তপ্ত হাওয়া ছুঁবল মরে হৃৎপিণ্ডে। কথাগুলো বলেই স্মৃতি চুপ করে রইল। স্বামীর বুক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে বারান্দার মেঝেতে স্থির করল। তার চোখের পল্লব ঘন, দিঘি দিঘি ভাব, ছায়াও আছে সেখানে। মাথার চুল কোমর ছাপিয়ে নামে পড়েছে। রুপাইয়ের চোখ সেদিকেই।

আজকাল তোমার কথার কিছুই বুঝতে পারি না। কী যে এক নেশায় তুমি ডুবে থাকো, তা বুঝতে পারি না! এ বলেই রুপাই একটু সময়ের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। নিজেকে মনে হচ্ছে খোঁয়াড়ে বাঁধা ছাগলের মতো। তখনই সে শুনতে পেল স্মৃতির বলছে, আমি চাই তাকে… তাকে বুকে জড়িয়ে বাঁচতে চাই।

অস্ফুট উচ্চারণ করল রুপাই, কী!

স্মৃতি তা শুনতে পেল না রুপাইয়ের কথা। তাই বলল, বলো তো আমি তোমাকে কি তোমার চাহিদামতো ভালোবাসি না?

অবশ্যই ভালোবাসো। কোনো সন্দেহ নেই, থাকারও কোনো কথা নয়। তবুও একহাত দূরে বসে রইল রুপাই; যেন কাষ্ঠখণ্ড। স্মৃতির কথাগুলো যেন ঠিকমতো তাকে স্পর্শ করতে পারল না।

এতটা সময় মানব আর কিছু চিন্তা করতে পারেনি। কেবল অনুভব করছে, কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনায় তার আচরণ- নিজের আচরণ এবং তার কারণ বিশ্লেষণ করে সে আবিষ্কার করল যে, সে রুপাইয়ের সামনে এমনভাবে বসে থাকতে লজ্জা পাচ্ছে। রুপাই তার পিসতুতো বোনের ভাসুর বলে নয়, সে স্মৃতির স্বামী বলে তার প্রতি যথেচ্ছ আচরণ করার ক্ষমতা আছে বলেই তার দুর্বল চিত্তে তার অপরাধবোধের সূত্রটি অসাধারণ উৎকট আকার লাভ করে প্রকট হয়ে উঠেছে। তার ওপর স্মৃতি ও রুপাইয়ের কথাবার্তা কেমন যেন রহস্যময়, আর, অকারণে প্রলাপ বলে মনে হতেই কেমন যেন একটা অন্ধকারের ভেতর থেকে, অগোচর স্থান থেকে ব্যাপারটা দুর্বোধ্য বলে মনে হচ্ছে। রুপাইকে তার স্ত্রীর ব্যাপারে অতিরিক্তই আগ্রহান্বিত দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া তার উগ্রভাবভঙ্গি তীব্রভাবেই প্রকাশ পাচ্ছে। স্মৃতির মৃদুতার আর কোমলতার এবং তার অন্তরের প্রণয় অশেষ বিহŸলতার তুলনা হয় না; সে কেবল মৃদু আর কোমলই নয়; ক্ষিপ্র একটি জ্যোতির স্রোতও বটে। তাকে স্পর্শ করাই বিপদ; তাতে অবগাহনের কল্পনা করা অসম্ভবই বটে। কিন্তু স্মৃতির মুখখানা অতিশয় বিষণ্ণ- তার অন্তরের অব্যক্ত ব্যথাটুকু যেন জাগ্রত মূর্তি ধারণ করে মানবের চোখে দেখা দিয়েছে। মনে মনে তার নিকটবর্তী হতে যেন মানবের ইচ্ছে হয়। সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে দাহজনক অনুতাপ এবং তারই সঙ্গে অপরিমেয় অস্থিরকর তৃষ্ণার সঞ্চার হলো। তাই অত্যন্ত অকস্মাৎ মানব বলে উঠল, জলখাবার তো হলো। এখন আমি যাই।

রুপাই বলল, ঠিক আছে। বিকেলে একবার এসো। জরুরি কথা আছে।

মাথা কাত করে সায় দিয়ে মানব শ্লথভাবে প্রস্থান করল। মানবের এই চলে যাওয়াটা স্মৃতির পছন্দ হলো না। বলল, কেন এমনভাবে চলে গেল।

রুপাই বলল, হয়তো তোমার অবুঝ জেরা ওর পছন্দ হচ্ছিল না।

অমূলক এত সহজেই সে অভাবনীয় উদাস ও আনমনা হয়ে গেল।

অমূলক বলা বোধ হয় সমীচীন নয়।

থাক ওর কথা। শোনো, বিয়ের সময় আমি যখন মাকে ছেড়ে আসি, তখন সে খুব কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু আমার তেমন কষ্ট হয়নি। বিবাহিত জীবনের স্বাদ ও একটি সংসারের প্রতিক্ষায় ছিলাম। এখনো আছি।

আমার মতো বাহ্যত নির্বিকার ঠাণ্ডা মানুষের মাথায়ও তোমার কঠিন কথাগুলো সহজে ঢুকে না। শুধু জানি…।

রুপাইকে বাক্য শেষ করতে না দিয়ে স্মৃতি আনমনে বলে উঠল, শুধু একটি সন্তান। একটুখানি মা হওয়ার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা লাভ করলে তোমাকে ধন্যবাদ জানাব। একটি সন্তানই আমার জীবনের একমাত্র আরাধনা। তখন আমি আর একা থাকব না। তখন আমাদের জীবনের সমস্ত সুখ ফেটে পড়বে নীরব হাসির বন্যায়। সে কী আনন্দ, সে কী সম্পূর্ণতা! শুধু একটি সন্তান। শুধু সে-ই শুধু পারে আমার সকল সত্যিকারের নিঃসঙ্গতা ধুয়েমুছে শেষ করে দিতে।

স্মৃতির কথায় ক্লান্তব্যর্থ নিশ্বাস ফেলল রুপাই, আর নিল বিষণ্ণ প্রশ্বাস, নিজেকে যেন মনে হচ্ছে একটা জরাবৃদ্ধ সাপ। তবুও বলল, কিন্তু সুখ অনেক রকমের রয়েছে; সুখের অনেক স্তর আছে। আমরা কি এখনকার সুখ নিয়ে এখন তৃপ্ত থাকতে পারি না?

কিন্তু আমি যে-সুখ চাই, যেখানে একটি সন্তানের খুবই প্রয়োজন রয়েছে। তাকে জড়িয়ে, তাকে কোলে নিয়ে সুখ উপভোগ করতে চাই।

আশ্চর্য, মানুষ কী রকম বদলায়। পদে পদে আমরা মোহ রচনা করে চলি। আর মনে মনে বলি, এটাই শেষ কামনা। এটাই চরম চাওয়া। কিন্তু একদিন কিছু হয়তো ঘটে, কিংবা ঘটেও না; আর সেই মোহ ভেঙে যায়, জীবন খোঁজে নতুন দিগন্ত। তখন দেখতে পাই, এতদিন যেটা কামনা করেছি সেটা একটি কলি মাত্র; সেই কলি সবুজ আবরণ ভেঙে যখন ফেটে বেরিয়ে আসে তখন বলি, এইবার সত্যিকারের আমার কামনা বাস্তবে পরিণত হলো। কিন্তু আবার গড়ে ওঠে নতুন মোহ। আবার তা ভেঙে যায়। জীবন চিরকাল নিজেকে ছাড়িয়ে যায়। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কিছুই শেষ হয় না, কিছুই চরমভাবে পাওয়া হয় না। কেবল সময় স্রোতের-পর-স্রোত প্রবাহিত হয়। পল্লবের-পর-পল্লবে ফুটে উঠে ফুল; আর নিজেকে ঝরিয়ে দেয় আবার নতুন করে ফুটে উঠা ফুলে। জীবনে সুখ কি দুঃখ, ব্যর্থতা কি সাফল্য- এসব বলে কি কিছু আছে? কেবলই ফুল ফোটানোর স্রোত। এই স্রোত কখনো থামে না, মিশে যায় কেবল মৃত্যুর মহাসমুদ্রে।

আমি এতসব বুঝি না। শুধু জানি, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

অবশ্যই, একে অপরকে ভালোবেসে। তোমার গুণের অর্চনা করার প্রচ্ছন্ন অভিলাষ আমার সবসময়ই রয়েছে।… তোমার মুখখানা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন; যদিও এই বিষণ্ণতার ছায়া মøানিমার অনুলেপনে চমৎকার অভয়প্রদ আর স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। কী হয়েছে তোমার?

তুমি যখন ভীষণ সুন্দর কিছু বলো…।

বাধা দিয়ে রুপাই বলল, সত্যিই তোমার কোনো তুলনা হয় না।

তোমাকে নিয়ে কী যে করি! তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি।

স্মৃতিকে কাছে টেনে নিল রুপাই। সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির পৃথিবী ঝাপসা হয়ে উঠল। পুলকে গা কাঁটা দিতে লাগল। একসময় স্মৃতিকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুপাই বলল, যাই এখন।

রুপাই মুখে একটা দুষ্টু হাসি মেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর স্মৃতি রান্নাকর্মে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

স্মৃতির ঝা পদ্মশ্রী একটু ঘুরতে বের হয়ে অনেক ঘুরে অনেক বিলম্বে বাড়ি ফিরে এলো। সে একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিজে একটু হালকা বোধ করে বলল, বড্ড দেরি করে ফেললাম।

পদ্মশ্রীর কথায় স্মৃতি কি বলবে ভেবে পেল না। ওকে সে চেনে। অনেকটা অন্তরঙ্গতায় নানারকম আবদারে সে ওস্তাদ। তবুও স্মৃতি ওর প্রতি কোনো রকম দুর্ব্যবহার করে না। কেউ তাকে অভদ্র বলুক তা স্মৃতি সহ্য করে না। ভদ্র বলেই সে ভীরু; আর ভদ্র ও ভীরু বলেই সে যেসব ত্যাগ স্বীকার করে আসছে তার তুলনা হয় না। তার তুল্য সম্পদ এই সংসারে আর নেই। তার মন আকাশের চেয়েও উদার; ততোধিক প্রশস্ত। একটা দীর্ঘনিশ্বাস মোচন করে শুধু বলল, হু।

ছোট্ট একটি উত্তর দিয়ে স্মৃতি একটু বাঁকা চোখে তাকাল। স্মৃতির কাছে পদ্মশ্রী অবিশ্বাসী হতে অবশ্যই চায় না। ওর কাছে সে অবিচ্ছিন্নভাবে ঋণী; কারণ, স্মৃতি ভারি স্নিগ্ধ, সুখদায়িনী আর ভারি অকপট। ওর স্থান পদ্মশ্রীর হৃদয়ে অটুট রয়েছে। স্মৃতির গৌরব চন্দ্রের মতোই নিজস্ব; তার মর্যাদা স্বতন্ত্রভাবে রক্ষিত। আর তাই পদ্মশ্রী জানতে চাইল, জানতে চাইলে না, কেন আমার দেরি হলো?

স্মৃতি একটু ম্লান এই হিসেবে যে, সে কখনো হৃদয় উন্মুক্ত করে দিয়ে কলকণ্ঠে আহ্বান করেনি- সংসারের প্রতি তার যা অবিস্মরণীয় কর্তব্য সে মনপ্রাণ নিবিষ্ট করে নিষ্ঠার সঙ্গে কায়মনোবাক্যে দিনরাত পালন করে যায়। সে অধর্মাচরণ করে না; কিন্তু আকাঙ্ক্ষার উদ্দাম বেগ আর প্রাপ্তির পরমোল্লাসে সে সৃষ্টি করেনি হিংসুক প্রবৃত্তি, যা নিয়ত সম্বিতে ক্রিয়াপরায়ণ থাকায় অভিনব কত চিন্তার উদ্ভব, নতুন নতুন কত আনন্দের বিকাশ হচ্ছে। আর তার শত সংসারকর্মে প্রেরণা জোগাচ্ছে। তাই হয়তো বলল, বলতে চাইলে বলো, শুনতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

অণিমা মাসির বাড়িতে ফেরিওয়ালা এসেছিল। তাই ছুটি গিয়েছিল।

তোমার ভাসুর শুনলে রাগ করবে। এখন তোমার বয়স হয়েছে, যখন-তখন পাশের বাড়িতে ছুটে যাও সে তা পছন্দ করে না। অলককে বললেই তো সে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দিতে পারে।

তা পারে। তবে আমার বয়সই-বা আর কত, বৌদি! লম্বা-চওড়া হলেই বয়স হয় নাকি?

তা নয়। তুমি যে কেন ও-বাড়ি গিয়েছিলে তা বললে না যে।

শাড়ির নিচের হাতটি নেড়ে পদ্মশ্রী বলতে লাগল, বলো তো আমার হাতে কি আছে?

জানি না! তবে সুন্দর কিছু হবে নিশ্চয়!

সুন্দর জিনিস সবাই দেখে। আমিও দেখি। চোখে পড়ে গেলে কি করা যায়। চোখ তো আর বন্ধ থাকে না। আমি আমার কাজ করি, আর চোখ তার কাজ করে।

তুমি কি বলছ, বুঝতে পারছি না।

কয়েক গজ কাপড়, কিছু রঙিন সুতো আর একটি ফিতে কিনে এনেছি ফেরিওয়ার কাছ থেকে।

এসব দিয়ে তুমি কি করবে?

আমাকে দেখে তুমি কিছু বুঝতে পারছ না!

কী! খুলে বললেই পার!

আমি…!

আর কিছু বলতে পারল না পদ্মশ্রী। স্মৃতির বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে এই কয়েকদিন পদ্মশ্রীকে ভালোভাবে দেখেনি। তার জীবনটা যেন বেশ তুড়ি মেরে চলছিল। রান্নাঘর আর রুপাই ছাড়া তার দৃষ্টি আর কোনোদিকেই ছিল না। এখন সে পদ্মশ্রীকে যত্ন করে দেখতে লাগল; যেন একটা কিছু বলার আগে সবকিছু দেখেশোনে নেওয়া। দেখতে দেখতেই বলল, শরীরটা বদলাচ্ছে বুঝি!

হ্যাঁ।

তুমি পূর্ণবর্তী হয়েছ! অবশ্য দেখলে বোঝা যায় না।

এখনো স্বাভাবিক দেখাচ্ছে, তাই না?

হ্যাঁ। আনন্দের খবর। তোমার ভাসুরও খুশি হবে। … সন্দেশ খাবে?

না, এখন কিছুই খাব না। খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছি।

কেন? মা হওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।

আমার শরীরটা ভেতর থেকে যেন পাক দিচ্ছে। সময়-অসময় ঝিম ধরে।

শোনো, তোমাকে কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি তো আছি।

শরীরে কতরকম এদিক-ওদিক হয়। একরকম থাকে না।

যখন যে-রকম হবে আমাকে বলবে। তাছাড়া অলক তো আছে। সে জানে তো এই সুখবর?

না। আজ সকালে গ্রামের চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে গিয়েছিলাম। তখনই জানতে পারি। তারপর যখন অণিমা মাসির বাড়িতে ফেরিওয়ালা এসেছিল ছুটে যাই, তোমাকে সুখবরটা দিতে তাই দেরি হয়ে গেল।

চিন্তার কোনো কারণ নেই।

তবুও চিন্তা হয়- দশমাসের ব্যাপার তো। দশমাস মানে দশটা চাঁদ আর দশটা অন্ধকার।

বুঝতে পেরেছি। শোনো তাহলে, সন্ধ্যাবেলায় খোলা-চুলে দাওয়ার নিচে নামবে না। প্রদীপ ছাড়া তুলসীতলায় যাবে না। কুলকুচি করে জল মুখের কাছে ছেটাবে না। ঢকঢক করে জল পান করবে না। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে, একা একা যাওয়া চলবে না। উত্তর বা পশ্চিম দিকে কখনো বেরুবে না।

তুমি এতকিছু জানো কীভাবে!

একটা সন্তানের মা হতে পারিনি বলে কি এসব জেনে রাখা উচিত নয়?

তোমার জন্য আমার বড্ড কষ্ট হয়, বৌদি। কিন্তু তোমার এই অবস্থার জন্য তুমি তো দায়ী নও।

সবই আমার ভাগ্য। এরকমই হয়তো-বা হওয়ার কথা ছিল।

তোমাকে একটা কথা বলি, শোনো, যখন সময় আসবে তখন ঠিকই তোমার কোলে একটা সন্তান এসে উপস্থিত হবে। জানো, আমার মামিমা প্রায় চৌদ্দ বছর পর আমার মামাতুতো ভাইয়ের মুখ দেখেছিল।

স্মৃতি যখন পদ্মশ্রীর চোখে চোখ রেখেছিল ঠিক তখনই পদ্মশ্রী অতর্কিতে এসব কথা বেমালুম বলে দিলো। কিন্তু স্মৃতির মনের ভেতরের জ্বালাটি নিবারণ করতে পারল না পদ্মশ্রী, যে জ্বালা প্রাণও সহ্য করতে পারে না। তবুও স্মৃতি দেখল, পদ্মশ্রীর চোখের ভেতর তার ভাইয়ের জন্য কী আশ্চর্য রকম একটি মায়া সৃষ্টি হয়েছে! সেই মায়াময় চোখদুটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্মৃতি বলে উঠল, তোমার ভাইটি এখন কোথায়?

তুমি আমার মামাতুতো ভাইটিকে চেনো। সে কিছু আগেও এই বাড়িতে এসেছিল; আবার হঠাৎ না বলেই পালিয়ে গিয়েছিল। তবে তার মুখে হাসি যেন সবসময় লেপটে থাকে। বন্ধুবৎসল। অসাধারণ তার কণ্ঠ। একটু বেশি মাত্রায় শৌখিনও বটে।

কে? মানব?

হ্যাঁ, মানবদা। তোমাকে একটা গোপন কথা বলি?

বুকের মধ্যে গোপন ব্যথা ধারণ করে স্মৃতি বলল, কী!

অনেকে বলে, সন্তান না হওয়াই মঙ্গল।

কেন?

সন্তান এলে নাকি অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। অনেক ঝামেলা সহ্য করতে হয়।

না, না, এমন কথা মনে স্থান দিয়ো না। তোমার ভাসুরও এরকম কথা বলে। কিন্তু তা একেবারেই ঠিক নয়। সন্তান জন্ম না দেওয়ার এই হচ্ছে একটি দুর্বল যুক্তি। আর তা যদি হতো, তাহলে এই পৃথিবীতে আর মায়েরা সন্তান জন্ম দিত না। একটি শিশু হচ্ছে গোলাপের মতো। ধৈর্যধারণ করে সন্তানকে লালনপালন করার বড্ড শখ আমার। যত যত্ন দেবে ততই সন্তান সুগন্ধি হয়। বিকশিত হয়। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সুন্দর, সুস্থ, আকর্ষণীয় একটি সন্তান মায়ের কাম্য।

স্মৃতির কথার প্রতিবাদ করা যায় তা পদ্মশ্রীর অজানা; তাই সে কতবার ভেবেছে, দৃষ্টির আড়াল হতে। যত সহজে ভেবেছিল সে আড়ল হবে, ততই দেখছে ওর আড়াল হতে ইচ্ছে করছে না। আঁচল মুখে চাপা দিয়ে সে কেন যে দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভালোই লাগছে, এবং কোনো একটা অজুহাতে আলাপ এগিয়ে নিতে পারলে মন্দ হয় না। তাই বলে উঠল, জানো, তুমি কত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে ভালো কাঁথা সেলাই করো।

তোমার জন্যও একটা সেলাই করে দেবো।

দেবে!

হ্যাঁ। তবে এখন তুমি রান্না কাজে একটু হাত দাও।

পদ্মশ্রী লজ্জা পেল। বলল, ঠিক আছে।

বিকেল। স্মৃতি একমনে কাঁথা সেলাই করে চলেছে; ঠিক তখনই মানব নানা তরঙ্গে মাথা নাচাতে নাচাতে এসে উপস্থিত হলো। সে যথেষ্ট সুশীল, অমায়িক ও ভদ্র। মানব জানতে চাইল, রুপাই বাড়িতে আছে?

স্মৃতি মাথায় আঁচল টেনে সেলাই রেখে এগিয়ে এলো; কিন্তু বাতাসে আঁচলটি মাথায় থাকতে দিলো না। স্মৃতি বলল, বাড়িতেই তো ছিল। তুমি ঘরে এসে বসো, ওকে ডেকে দিচ্ছি। তুমি এসেছ শুনলে এক্ষুনি চলে আসবে।

চেয়ার টেনে মানব বসে পড়ল, পাথরের ভাস্কর্যের মতো। চওড়া বুক। বলিষ্ঠ দেহ। পুরাণের দেবতার মতো যেন মুখ। কোঁকড়ানো চুল। সমুদ্রের মতো চোখদুটি। মানব অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল স্মৃতির আগমনপথের দিকে। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, কিরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, এবং তার কর্তব্য ও বক্তব্য তখন কি দাঁড়াবে। স্মৃতিকে দেখলেই যেন তার তার অন্তরে একটা ভাবের জন্ম হয়। বেদান্তে যাকে বলে পূর্ণতা। স্মৃতির সঙ্গ যেন তার নিঃসঙ্গ সময়টাকে প্রসন্ন করে তোলে। তখন তার মন চায় অনেক অনেক বছর বাঁচতে। তখনই এক গ্লাশ শরবৎ ও কয়েকটা সন্দেশ নিয়ে ফিরে এলো স্মৃতি।

বিকেলের রোদ নরম হয়ে এসেছে, জানালা দিয়ে তার এক চিলতে ঘরের মধ্যে বিছার ওপর এসে পড়েছে। তখনই তার চোখ পড়ল স্মৃতির রেখে যাওয়া কাঁথাটির দিকে। সেদিকে তাকিয়ে মানব বলল, তুমি কাঁথা সেলাই করছিলে বুঝি! ঈশ্বর কতই না গুণ দিয়েছেন তোমাকে!

আঁচলে ভিজে হাত মুছতে মুছতে স্মৃতি মিষ্টি হাসল। বিছানার একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, মানুষের ভালোবাসাই মানুষকে গুণী করে। তুমি আমাকে ভালোবাসার চোখে দেখো তো, তাই…।

লোকে কী বলে জানো, ভালোবাসা পুড়ে যায় সংসারের উত্তাপে।

এ-ই তো নিয়ম। সেটাই তো স্বাভাবিক।

তবুও মানুষ মানুষকেই ভালোবাসে। আমারও যে খুব লোভ হয় ভালোবাসা পেতে।

তোমার মতো যারা মুক্ত, স্বাধীন চেতার- সীমাহীন যার সীমানা- মানুষ কি পারে ভালোবাসার গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে জীবনটা নষ্ট করে দিতে!

সে চিন্তা তোমার নয়, আমার। ভালোবাসার আহ্বানে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। কিন্তু কথা হচ্ছে আমি তো সেই আহ্বানই পাচ্ছি না। থাক এসব কথা। এখন তুমি লক্ষ্মী কত্রীর মতো তোমার কাজ করতে থাকো। আর আমি শরবৎ ও সন্দেশ খেতে খেতে রুপাইয়ের অপেক্ষা করি।

আমি তো আমার কাজে বাধা দিচ্ছ না, তাছাড়া তোমার বন্ধু যত্ন করে গাছে জল দিচ্ছে, তাই মনে হয় শীঘ্রই আসতে পারবে। তাই তোমার সঙ্গ আমাকেই দিতে হচ্ছে। তোমার কথা শুনতেও আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না।

আচ্ছা, যদি কন্যা হয় তাহলে তুমি তার নাম কি রাখবে তোমার নামের সঙ্গে মানিয়ে?

কী?

আমি খুব খুশি হব।

হায়-রে, এ কাঁথা আমার জন্য নয়।

তো কার জন্য?

অলক ও পদ্মশ্রীর সন্তানের জন্য।

পদ্মশ্রী মা হতে চলেছে বুঝি! খুবই আনন্দের কথা। আমি তাহলে মামা হতে চলেছি।

আমি হব জ্যেঠিমা।

হয়তো-বা পদ্মশ্রীর সন্তান তোমার জন্যও সুখবর বয়ে আনবে! তোমার কোলে একটি শিশু খুবই প্রয়োজন।

হ্যাঁ, একটি শিশু… শুধু একটি শিশুই আমার প্রয়োজন।

স্মৃতির মুখ সহসা গম্ভীর হয়ে গেল। এভাবে গম্ভীর হয়ে যাবে তা কখনো মানব কল্পনা করতে পারেনি। মানব খুব চালাকচতুর মানুষ, তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, রুপাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখে আমি সত্যিই গর্বিত। অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি- সবই ওর করায়ত্ত; কিন্তু একটা জিনিস আমার পছন্দ হয় না।

কোনটি!

দর্প, অহংকার, আত্মম্ভরিতা আর তোমার প্রতি তার অবহেলা।

আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো, তবে অহংকার আর অবহেলা…।

তাহলে তুমি রুপাইকে বলো, কৃষিকাজে এত সময় নষ্ট না করে তোমার দিকে একটু নজর দিতে। সে তো শুধু টাকার পিছনে ছুটতে ব্যস্ত। কিন্তু ধনসম্পত্তি কোনো কাজে আসবে না। একটা সন্তানই পারে তার বংশ রক্ষা করতে।

স্মৃতি ভাবল, তাকে আমাকে চেষ্টা করতেই হবে। তার মনে হচ্ছে, জন্ম কেন তার হলো, আর লাঞ্ছনাই-বা কেন জীবনভর পুয়াতে হচ্ছে। তার কী অপরাধ! কি কারণে সবাই তাকে অভিশাপ দেয়। স্মৃতি যখন এসব ভেবে চলেছে ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল পদ্মশ্রী।

স্মৃতির উদ্দেশে পদ্মশ্রী বলল, জলখাবারের আয়োজন করে এসেছি, বৌদি। চুলোও ধরিয়ে রেখেছি এখন তুমি গিয়ে একটু দেখো।

স্মৃতি বলল, পদ্মশ্রী এই ফাঁকে তুমি তোমার দাদাকে একটু সঙ্গ দাও। তারপর মানবের উদ্দেশে যোগ করল, মানব তুমি পদ্মশ্রীর সঙ্গে গল্প করো। আমি গিয়ে দেখি মুখরোচক কিছু কি তৈরি করতে পারি।

মানব হেসে উঠে বলল, আমার কিন্তু ভালো জলখাবার চাই। ক্ষুধার্ত নই যদিও, তবে লোভার্ত।

পদ্মশ্রীও হেসে উঠল। সে খোলামেলা মনের মানুষ। শব্দ করে উচ্চকিত হাসি হাসে। মাঝেমধ্যে চেঁচিয়েও কথা বলে। দেখে মনে হয়, কোথাও কোনো ক্ষোভ নেই, আবার কোনো অহংকারও নেই। সে বলল, বৌদির বানানো সুস্বাদু জলখাবার তুমি উপভোগ করবে।

হা-হা করে হাসতে অভ্যস্ত মানব কেমন যেন ঠোঁট চেপে মিটমিটে একটা হাসি মাখিয়ে বলল, তাহলে বলে রাখছি, পেটচুক্তি খাওয়া। আহার নয়, আহূতি। আমি নিদেশ না করা পর্যন্ত আমাকে খাবার দিয়ে যেতে হবে।

মানব কুস্তিগীর। যেমন তার শরীর, সেইরকম তার আহার। স্মৃতি মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসে। তাই সে মহোৎসাহে চলে গেল মানবের জলখাবারের ব্যবস্থা করার জন্য।

স্মৃতি রান্নাঘরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল পাশের বাড়ির অণিমা মাসি এসে উপস্থিত। অণিমা লম্বা ধরনের নারী। চোখ টানা টানা। চুল টেনে বাঁধার অভ্যাস তার। শরীরের রং শ্যামলা। এই বয়সেও তার এক অপূর্ব লাবণ্য শরীরে, বিশেষ করে মুখে দেখা যায়। তার মুখে এমন এক ব্যক্তিত্ব আছে যে, তাকে অবহেলা করা স্মৃতির পক্ষে সম্ভব নয়।

অণিমা বললেন, বড়ো বউমা এখনো জলখাবারের ব্যবস্থা হয়নি? ছোটো বউমা আয়োজন করতে বুঝি সময় নিয়েছে।

না গো মাসি মা, পদ্মশ্রী তো অনেক আগেই সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে। আজ পদ্মীশ্রীর ভাই এসেছে তো, তার সঙ্গে একটু আলাপ করছিলাম তাই দেরি হয়ে গেল।

আমি অনেক আগেই তোমার মেসোর জন্য জলখাবার বানিয়ে রেখেছি।

বাড়িতে এত লোক থাকতে তুমি কেন রান্নাবান্না করো?

আমি রান্না না করলে তোমার মেসো রাগ করেন। অন্যদের হাতের রান্না তিনি মুখে তুলতে পারেন না। তাই এই বয়সেও আমাকেই রান্নাবান্না করতে হয়।

মেসোর মন মতো রান্না বউদের শিখিয়ে দিলেই তো পার!

শিখিয়ে দিয়েছি তো, কিন্তু তোমার মেসো আমার হাতের তৈরি খাবার ছাড়া মুখে তুলেন না। থাক এখন তোমার মেসোর কথা। আমি অন্য-একটা ব্যাপারে তোমার কাছে এসেছি।

স্মৃতির বুকটা কেঁপে উঠল। চারপাশে পড়ন্ত রোদ, রান্নাঘরের জানালায়ও, তবুও তার মুখকে ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। অণিমা অপলক তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। এই অপলক তাকিয়ে থাকা অবশ্য তার ¯^ভাব। স্মৃতির মনে খুব ইচ্ছে হচ্ছে জানতে, এভাবে অপলক তাকিয়ে তিনি কী দেখছেন! তার ভেতরে কি কোনো বন্ধ্যাসূত্র তিনি আবিষ্কার করছেন? তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কোন ব্যাপারে!

তুমি কী জানো, ছোটো বউমা মা হতে চলেছে।

হ্যাঁ, জানি।

হায় ঈশ্বর, তোমার তো অনেক দিন হয়ে গেল, কিন্তু একটি সন্তানের মুখ দেখাতে পারলে না।

তিন-তিনটে বছর।

এত বছর?

হ্যাঁ, মাসিমা।

একদিন অবশ্যই পেয়ে যাবে! আমার কথাই ধরো।

কী!

আমার প্রথম স্বামী তো তোমার কাকা ছিল। তোমার মা আমাকে খুব যত্ন, আদর করতেন সেকথা অবশ্যই তুমি ভুলোনি!

তা অনেক দিন আগের কথা। অনেক দিন হয়ে গেছে আমি বাপের বাড়ি যাইনি।

সময় করে একবার ঘুরে আসলে পার!

হু।

তুমি হাসছ।

না, এমনি।

তোমার কাকার ঘর করা আমার কপালে ছিল না।

তবুও চার-চারটে বছর ছিলে।

কিন্তু কোনো সন্তান দিতে পারেনি তোমার কাকা। এজন্য কত অত্যাচার আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল।

গ্রামের বউ-ঝিরা তোমাকে বন্ধ্যা বলত।

ভীষণ অপবাদ!

তোমাকে একটি প্রশ্ন করি মাসিমা?

করো!

তোমার কথা শুনে আমার মনে যে প্রশ্ন জেগে উঠেছে তা অনেক দিন ধরেই মনের গোপনে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই।

করো।

এর উত্তর তোমার অবশ্য জানা আছে।

আগে করো, তারপর আমার জানা থাকলে উত্তর দেবো!

আমার কেন কোনো সন্তান হয় না? আমি কী আজীবন বন্ধ্যা হয়েই থাকব?

কে বলেছে তুমি আজীবন বন্ধ্যা হয়ে থাকবে। তবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তোমার কাকাই আমাকে সন্তান থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল।

তাহলে দোষটা তোমার ছিল না, ছিল কাকার।

অন্যায় অপবাদে চার-চারটে বছর আমাকে মানসিক কষ্টের মধ্যে রেখেছিল।

এই যাতনা সহ্য করতে না পেরেই তুমি একদিন…।

হ্যাঁ, একদিন মনে মনে ভাবি, আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি বন্ধ্যা নই।

অন্যায় অপবাদ সহ্য করার মতো আমারও আর ধৈর্য নেই।

ধৈর্য তো ধরেছিলাম চার-চারটে বছর।

তাই বুঝি সমাজ ও পরিবারের কথা মাথায় স্থান না দিয়ে হঠাৎ…।

হঠাৎই পালিয়ে যাই, তাছাড়া তো আমার সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।

কাকা অবশ্য ঘোষণা করে বসল, তোমাকে আর ঘরে তুলবে না।

তার আর কি দোষ! পঞ্চায়েত বসেই সিন্ধান্ত নিয়েছিল আমাকে আর সমাজে তোলা হবে না। আমি রক্ষা পেলাম। হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। দ্বিতীয়বার সংসার পাতার সুযোগ পেলাম।

কাকাও পাতল।

কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না। সে সন্তানের মুখ দেখতে পারেনি। অন্যদিকে…।

অন্যদিকে?

আমি ছয় পুত্রের জননী হলাম।

কাকা নিঃসন্তানই রয়ে গেল।

তাহলে বুঝতে পারলে বড়ো বউমা, আমার সিন্ধান্তই সঠিক ছিল।

অবশ্যই মাসিমা।

বড়ো বউমা তোমাকে একটা একান্ত প্রশ্ন করি, রুপাই কি তোমাকে সুখী রাখতে পেরেছে?

কী যে বলো মাসিমা! আমাকে রাজরানি করে রেখেছে।

আমি বলতে চাচ্ছি… থাক অন্যসময় বলব। এখন তোমাকে বলি, আমাদের আশ্রমে একজন সাধুবাবা এসেছেন, তিনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে দিতে পারেন। তুমি চাইলে তোমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি। একথাই তোমাকে বলতে এসেছি আমি।

অণিমা খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিলেন, যেন কেউ শুনতে না পায়। অণিমার কথাগুলো নিতে ভারি কষ্ট হচ্ছে স্মৃতির, বোঝা যাচ্ছে। স্মৃতির মনে হচ্ছে এসময় এসব কথা বলা উচিত নয়। কথাগুলো খুবই কুৎসিত মনে হলো তার।

মাসিমা একটু বুঝে পরে বলি। আর মনে মনে বলল, কিছুতেই আমার মনের কথা তোমাকে প্রকাশ করতে পারি না, মাসিমা। ভেতরে লুকিয়ে রাখাই উত্তম। যদি এখন একটা আয়না থাকত, তাহলে আমার মনের কথা ধরা পড়ত, তাহলে তুমি ভীষণ আঁতকে উঠতে।

আমাকে এখন উঠতে হবে বড়ো বউমা, তোমার মেসোকে জলখাওয়ার দিতে হবে।

ঠিক আছে যাও। পরে কথা হবে।

স্মৃতি থালাভর্তি ফুলকো লুচি নিয়ে এলো। পটল ভাজা। মিষ্টি। পদ্মশ্রী পেছন পেছন জলের গ্লাস এনে টুলের ওপর রাখল। কিছুক্ষণ আগে রুপাই আসায় পদ্মশ্রী রান্নাঘরে পালিয়ে গিয়েছিল।

স্মৃতির উদ্দেশে মানব বলল, এতসব কি করেছ।

স্মৃতি মিষ্টি হাসল। খাটের কোণ ঘেঁষে বসতে বসতে বলল, চা ও বিস্কিট দেবো।

মানব সামান্য একটু হাসল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। স্মৃতি ও পদ্মশ্রী চা আনতে চলে গেল।

রুপাই খাটে বসে লুচিতে হাত দিতে দিতে বলল, মানব, এই কয়েকদিন তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে খুঁজেছি ঢের। অবশ্য চিৎকার করে নয়।

মানব বলল, বাড়ির জন্য মনটা বড়ো উতলা হয়েছিল।

রুপাইয়ের ঠোঁটদুটি হাসিলে ভর উঠল। বলল, তা হওয়া সম্ভব। বাড়িতে মা-বাবা আছেন। তবে বলে গেলে পারতে।

মানব নিশ্চুপ।

রুপাই বলল, কিন্তু দেখছি, মিথ্যে কথা বলতে তোমার বাধছে না। সত্যি নয় কি?

মানবের মুখমণ্ডলের স্বাভাবিক বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে ইষৎ রক্তবর্ণ ধারণ করল। রুপাইয়ের ঠোঁটের হাসি আরও খানিটা উত্তোলিত হলো; বলল, এই তো ধরা পড়ে গেলে মানব। মুখ লাল হয়ে উঠছে। বলোই না কারণটা কি ছিল?

মানক কাতর কণ্ঠে বলল, মাপ করো।

মাপ আমি করেছি। আমার কথা শুনে তুমি বুঝতে পারলে না; আমি তোমাকে মাপ করেছি। অবশ্য কারণটা আমি জানি।

চোখের পলকেই মানবের মুখ আর তালু শুকিয়ে উঠল। নিজের মস্তক ভারি নির্জিব হয়ে উঠল। কারণটা রুপাই কি করে জানে? নাকি অনুমান করে বলছে? নাকি স্মৃতির মুখে কিছু শুনেছে? নাকি মানবকে খানিকটা খেলে মজা লুটছে? কিন্তু তা নয়! রুপাইয়ের উৎফুল্লতা স্বভাবতই অপরাজেয়। বলল, তুমি শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে উঠলে যে মানব! তুমি বাড়িতে যাওনি, আমি খবর নিয়ে জেনেছি। এও জানি তুমি হতো স্মৃতির উৎপাতে এখান থেকে চলে গিয়েছিলে, তা নয় কি?

রুপাইয়ের এমন প্রশ্ন মানবের অতিক্রম করা সাধ্যাতীত। তবুও সে চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। জবাব দিতে নয় প্রশ্নকর্তাকে উপলব্ধি করতে। উৎপাতের অর্থ কি তা তাদের কারও না বোঝার কথা নয়। মানবের ধৈর্যের প্রসংশা করতেই। শক্ত হয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই হ্যাঁ-না কোনো উত্তর দিলো না।

রুপাই বলল, তুমি দাঁত চেপে বসে থাকো। বেশ। তবে আমি টোকা মেরে তোমাকে একটু পরীক্ষা করিছি মাত্র। আমি খুব নির্লজ্জ। তবে জানি, তুমি স্মৃতিকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলে। কিন্তু স্মৃতির পিতা রাজি হননি।

এ বলে রুপাই একটা ধাক্কা দিয়ে মানবের চোখের আঁতকানোটাকে উপভোগ করল। তারপর বলল, তোমার কাছে এসব এখন বলছি কেন জানো?

মানব মাথা নাড়াল। তাকে গুহ্যকথা বালার কারণ সে জানে না।

রুপাই জানাল, আমার ও তোমার বয়স একইরকম। তবুও আমি স্মৃতিকে একটি সন্তানের মুখ দেখাতে ব্যর্থ। আর তাই ভেবে নিলাম তুমি স্মৃতির উৎপাতে এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলে। কিন্তু ফিরে আসায় মনে হচ্ছে তুমি আমার একান্ত বিশ্বাসভাজন।

স্মৃতি চা ও বিস্কিটের থালা নিয়ে হাজির হতেই তাদের কথাবার্তা আর অগ্রসর হলো না।

চা ও বিস্কিট খাওয়ার পর, রুপাই চলে গেল। উঠোন থেকে রোদ সরে গিয়েছে। দূরে, গ্রামের মাঠ ফসলে ভরে উঠেছে। আগাছা পরিষ্কার করার জন্য রুপাই চলে গেল। তবে যাওয়ার আগে মানবকে বলে গেল রাতের খাবার একসঙ্গেই করবে। তাছাড়া এখানে যেন সে কিছুদিন থাকে।

মানব হালকা গান গাইতে লাগল। এই গানে কোনো আবিলতা নেই, নিরন্তর এক গানের মতো তার ভাষা। সুদৃশ্য এক জগৎ তৈরি করে চলেছে। এই গান শুনলে, হৃদয়ের পল্লবে যেন চৈতালি এসে ধরা দেয়। ভারি আশ্চর্য কণ্ঠ তার। গান শেষ করে মানব বলল, গান গাইলে আর কোনো দুঃখ থাকে না। গান আমাকে সব ভুলিয়ে রাখে। … রুপাই যে দেখছি, সবসময়ই অনুপস্থিত। বাড়িও ফেরে মনে হচ্ছে বেশ রাত করে। ওকে ছাড়া সময়টা একেবারে ফাঁকা।

স্মৃতি বলল, আসলে নিজের দু-একটা কাজ আছে, কাছেই গেছে। সে আসলেই একটা রহস্যময় মানুষ। ও না থাকলেও তোমার কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। আমি তো সঙ্গ দিচ্ছি। ও হয়তো ভাবতে পারেনি তুমি আসবে।

ভাবার কথা নয়। তোমার বাবা ভালো পাত্র দেখেই তোমাকে তুলে দিয়েছিলেন?

ওর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির লীলাখেলায় বাবা তার হাতে আমাকে তুলে দিতে দ্বিধাবোধ করেননি, বরং অতি উৎসাহে গৌরবান্বিত হয়ে কন্যাদান করলেন।

রুপাই দেখছি দুর্জ্ঞেয় রহস্য ভেদ করতেও সক্ষম হয়েছে।

সেজন্যই হয়তো-বা দৃষ্টিবিনিময়ের সময় তার চোখে আমাকে দেখতে পাই। সেখানেই যেন আমার নিবাস গড়ে উঠল।

মানব স্বগত উচ্চারণ করল, আমার মতো একজন পুরুষ তোমাকে পেয়ে স্বর্গলাভ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা তা হতে দেননি। তাই তাড়াতাড়ি করে তোমার বিয়ে দিলেন রুপাইয়ের সঙ্গে। সেকথা হয়তো তুমি জানো না; জনলে কী আর এভাবে আমাকে অবহেলা করতে!

স্মৃতি বলল, তুমি বিড়বিড় করে কী বলছ?

কিচ্ছু না।

কিচ্ছু না মানে… অবশ্যই তুমি কিছু বলছিলে…।

ভাবছিলাম, আমার গানটি কেমন হলো।

বেশ।

কোথাও যেন একটা জীবন আছে, জীবনের ভেতর এক সত্য আছে, সেই সত্যটাকেই সবাই আবিষ্কারের ইচ্ছায় আমার গানের মধ্যে একটা রঙিন চিত্র তৈরি করে তৃপ্তি পায়।

কিন্তু…।

কিন্তু আবার কী!

আমি ভাবছি অন্যকথা। তুমি অন্ধ-মূঢ়-ভীরু। অনন্ত রূপ দূরে ঠেলে দিয়ে রুপাইয়ের কাছে পরাজয় মেনে নিলে।

সত্যিই আমি অন্ধ-মূঢ়-ভীরু।

স্মৃতি হেসে ফেলল। তারপর বলল, তুমি নির্বোধও বটে। তাই দিশে না পেয়ে পালালে।

আতিথ্যগ্রহণ আর প্রেমবিনিময়- এই দুইয়ের মধ্যে যে পার্থক তা অনুভব করতে পারিনি। তাই আমি দৃষ্টিহীন, অসাড়, ক্লীব।

মানব একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। সে জানে, নানা বাহানায় স্মৃতির কাছে ছুটে আসে, কিন্তু ফিরে যায় শূন্যতা নিয়ে। মানবের কথা হয়তো-বা স্মৃতি বুঝতে পারল না। তাই বলে উঠল, দেখো, দেখো, আমার কাঁথাটি কেমন সুন্দর হচ্ছে।

খুব সুন্দর। মনে হচ্ছে মনের মাধুরী মিশিয়ে সেলাই করছ। সুখদুঃখের বিচিত্র সমাহার যেন। তারপর সসংকোচে মানব বলল, আর তুমি…।

কাঁথা নিয়ে যে বসে আছে সে যেন মানবের বর্ষাপ্রভাতের রজনীগন্ধা, রজনীর প্রসাধনরম্যা রজনীবালা। মানবের কাছে মনে হচ্ছে, এই বসে থাকা রমণীটির অঙ্গাভরণে সুস্পষ্ট বিহŸলতা প্রকাশ পাচ্ছে।

স্মৃতি অবাক হয়ে বলল, কী!

তুমি যার জন্য অপেক্ষা করছ… সে…।

সে কখনই আসবে না। সে শুধু আমার মনের পাগলামি!

মানে!

মানে, আমি ফলশূন্য।

অবশ্যই তুমি ফলশূন্য নয়। রুপাই ইচ্ছে করলেই তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারে।

না, পারে না। তার কোনো দোষ নেই, সবই আমার ভাগ্য।

শুধু একটি শিশুই পারে তোমাকে সুখী করতে। সন্তান লাভের মাঝেই তুমি আনন্দ খুঁড়িয়ে নিতে চাও। সে-ই শুধু পারে ধুয়ে নিতে তোমার আত্মগ্লানি, দুঃখকষ্ট- সবই।

অদৃষ্টদোষে যেভাবে জন্মেছি, সেই বেড়াজাল ভাঙতে কার সাধ্য আছে!

তোমার কথায় আমার হৃদয় যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আমি সবসময়ই তোমাকে সুখি দেখতে চাই। তবুও তুমি তোমার দুঃখ-কষ্টে আমাকে পাশে ঘেঁষতে দিতে চাও না। তুমি সবসময়ই কেমন যেন মনমরা মনমরা থাকো!

আমি সাধারণত মনমরা থাকি না; তবে আমার এমন থাকার কারণ তো আছে, তাই না।

না, নেই। তুমি জানো না, তোমার কোনো তুলনা নেই।

আরে না, তুমি ভুলে গিয়েছ আমি এক বন্ধ্যা নারী।

মানব দৃঢ় কণ্ঠে বলল, চুপ করো। এই বন্ধ্যা শব্দটি শুনলে আমার মাথায় রক্ত চেপে যায়।

ঠিকই আছে, আর বলব না।

আজকাল শুধু নয়, আর কোনোদিনই বলবে না।

হঠাৎ স্মৃতির দৃষ্টি আবেগময় হয়ে উঠল মানবের কৃষ্ণকালো মুখ দেখে। তখনই সে হঠাৎ শুনতে পেল দূর থেকে ভেসে আসা একটি কান্নার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গেই স্মৃতি শুধাল, শুনতে পাচ্ছ?

কী!

শিশুর কান্না মনে হচ্ছে!

হয়তো-বা।

খুব কাছ থেকেই যেন আসছে।

আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তোমাদের ফলের বাগানে প্রতিদিন এমন সময় ছেলেমেয়েদের ভিড় জমে, বাগানের ফল চুরি করাই তাদের কারবার।

না, না… ফলের বাগান থেকে আসছে না। মনে হচ্ছে পুকুর থেকে। জলে পড়ে গেল না তো কেউ?

জলের তো কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না।

হবে এ আমার কল্পনা!

রুপাই বাড়ি ফিরতেই দেখতে পেল স্মৃতি ও মানব গল্প করছে। তাদের এরকম করে গল্প করাটা যে তার কাছে খারাপ লাগছে তা নয়। মানব বিনয়ী নম্র। তাছাড়া তার অনেকরকম গুণ রয়েছে। কিন্তু একজন মানুষকে বাইরে থেবে বোঝা যায় না কোথায় তার গর্ব, কোথায় সুখ, আর তার বুকের ভেতরে কোথায় সে একেবারে সকলের চেয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আছে। রুপাই দিব্যি বুক ফুলিয়ে বলল, তোমরা কীসের গল্প করছ?

কথাটার মধ্যে একটা চাপা গর্বও ছিল। মানব উত্তর দিলো, তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আর তোমার স্ত্রীর নকশি কাঁথার বুনন দেখছি।

রুপাইয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর, অ।

মানব খুব রহস্যজনকভাবে হাসল। এমনভাবে সে হাসে যখন কোনোকিছুর ব্যাপারে দুষ্টুমি করে তখন। মানবের একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে সে সকলকে আপন করে নিতে পারে সহজে। সে যেমনি জমিয়ে আড্ডা দিতে পারে, তেমনি একেবারে নিশ্চুপ হতেও সময় নেয় না। তাই মানব নিশ্চুপে উঠে দাঁড়াল।

রুপাই বলল, কোথায় যাচ্ছ?

গ্রামটা একটু দেখে আসি। সারাদিন তো এখানেই কাটিয়ে দিলাম।

সে আর কোনো কথা না বলে চলে গেল। মানব এভাবে চলে যাওয়ায় ওর মনে কোনো ক্ষোভ নেই। তবে তার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রুপাইয়ের মুখের চিন্তিত রেখাগুলো কেমন যেন প্রশ্নচিহ্নের মতো জেগে উঠল। মাথায় প্রশ্নচিহ্ন নিয়েই রুপাই বলল, ওর সঙ্গে এত আড্ডা দেওয়া তোমার ঠিক হচ্ছে না।

কেন এভাবে আড্ডা দিলে অসুবিধে কীসের? তাছাড়া আমি ইচ্ছে করে তো দিইনি। সে বসেছিল তোমার জন্যই।

আমি বুঝতে পারি না, সে কেন ওর ঘরে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারল না। তুমি কি ওর জন্য ঘরটা তৈরি করে দাওনি।

দিয়েছি। তবে সে আমাদের অতিথি। তাই ওকে সঙ্গ দেওয়া কর্তব্য।… তোমার এমন কৃৎসিত কথা শুনলে সে আহত হবে, সেটা ভাবা উচিত ছিল। বরং ওকে একটু সমীহ করা প্রয়োজন ছিল। সে তোমারই বন্ধু।

রুপাইয়ের বুকে খিচখিচ শুরু হলো। এমন একটা ভুল সে করে ফেলল। তাই প্রসঙ্গ পালটাতে সে বলে উঠল, পাড়াপ্রতিবেশীর কথা ভুলে থাকা যায় না!

পাড়াপ্রতিবেশী!

আমি কিছুই বলতে চাই না, শুধু বলতে চাই পাড়াপ্রতিবেশীর কথা একটু ভাবা দরকার। ওদের কুচিন্তা করার জন্য খুরাক জোগান না দেওয়াই উচিত।

স্মৃতি আপত্তি জানিয়ে বলল, মশকিলটা কোথায় জানো! তোমার পাড়াপ্রতিবেশীদের কুচিন্তার সুযোগ কেউ করে দিতে হয় না। যদি ওদের খুরাক জোগাতে সক্ষম হই তাহলে আমার মতো খুশি আর কেউ হতো না।

স্মৃতি দেখতে ভারি সুন্দরী। খুব সুন্দর বলেই মাঝেমধ্যে তাকে খুব অহংকারী মনে হয় রুপাইয়ের কাছে। আর তাই সে গটগট করে বলে উঠল, এত অহংকার ভালো না। অবশ্য সুন্দরী নারীদের এমনটাই ¯^ভাব!

স্মৃতি বুঝতে পারল, তার প্রতি রুপাই বিরক্ত। বলল, এটা কিন্তু তোমার বাড়াবাড়ি হচ্ছে!

কোনটা?

এই যে পাড়াপ্রতিবেশীর অজুহাতে আমাকে…।

প্রশ্ন করেছিল রুপাই ঠিকই, কিন্তু উত্তরটা শোনার দিকে কান ছিল না। তাই ছোটো দুটি শব্দ উচ্চারণ করল, ও, সেটা।

স্মৃতি শান্ত গলায় রাগে ফেটে পড়ল, রুপাইয়ের ওপর। বলল, আমার খুব ইচ্ছে করে একজন নারী হওয়া। আর যাই হোক অন্ততপক্ষে একটি শিশুর মুখ দেখতে পারতাম। তুমি আমাকে সে ক্ষেত্রেও বঞ্চিত করে রেখেছ।

স্মৃতির কথা রুপাইকে দুর্বল করে দিলো। স্ত্রীর কাছে কোথায় যে রুপাই আটকা পড়ে আছে তা সে জানলেও স্মৃতি জানে না। রুপাই কোনো উচ্চবাক্য করল না, বরং শান্তিবাণী ঝারল, আর কথা কাটাকাটি করে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে তুমি যা করছিলে তাই করো। আমি মানবের খুঁজে গেলাম।

সন্ধ্যার পর বেড়িয়ে রুপাইয়ের সঙ্গে মানব বাড়ি ফিরে এলো। মানবকে তার ঘরটি দেখিয়ে রুপাই চলে গেল স্মৃতির কাছে। মানব ওর জন্য বরাদ্দ ঘরের চৌকাঠের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াল। এ কি তাজ্জব! এ কোথায় এলো- এ-যে ইন্দ্রপুরী! ইন্দ্রপুরী বলতে বর্ণনায় অতিরঞ্জিত হয়। অতিশয়োক্তি-দোষ ঘটে। তবে সত্যি সত্যিই গতবারের চেয়ে এই ঘরের পরিবর্তন ইন্দ্রপুরীর মতোই মনে হচ্ছে। চমৎকার সুখপ্রদ। সুশোভিত। চোখ বিস্ফারিত করে মানব চারদিক দেখতে লাগল। প্রদীপের আলোও অত্যুজ্জ্বল। তাই তার মনে হলো সে ইন্দ্রপুরীতেই প্রবেশ করেছে।

অবাক হয়ে মানব দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় পদ্মশ্রী দেখা দিলো। বলল, দেখছ কি দাদা? তোমার জন্য আমিই ঘরটা সাজিয়েছি।

চমৎকার। আমার বোনের গুণ দেখে প্রসংশা করতেই হয়।

আমার ভাসুর বলেছিলেন, একটুখানি এদিকে ওদিকে হলে রক্ষা নেই।

কাকে বলেছিল?

আমাকে আর বৌদিকে। তুমি এখন একটু বিশ্রাম নাও। আমি রাতের রান্নার আয়োজনে গেলাম।

মানব একটু আনমনা হয়ে বলল, ভালো। যা।

পদ্মশ্রী চলে গেলে মানব তক্তাপোষে বসল। এই খাটটিকে তার খুব আপন ও দৃঢ় একটা আশ্রয় বলে মনে হলো। রুপাইয়ের কথার আলোড়ন তার অভীপ্সা আরও ফেনিয়ে উঠল। রুপাইয়ের চঞ্চল ভঙ্গি, বাঁকা বাক্যালাপ, স্ত্রীর প্রতি অবহেলা- এসব তার মনে যে অশ্রাব্য তিক্ততার জন্ম দিয়েছিল তা এখন সরে গিয়ে, সলিতা ঠেলে দিয়ে দীপ উজ্জ্বলতর করার মতো রুপাইকে রাশভারি লোকে পরিণত করল। সে বিশ্রামে না গিয়ে উঠে দাঁড়াল। পুকুরে গিয়ে স্নান করল। ফিরে এসে তার ব্যাগ থেকে একটি চিরুনি বের করে চুল আঁচড়াল। একটা গেঞ্জিও গায়ে জড়াল। তখনই পদ্মশী এসে জানাল, খেতে এসো দাদা।

রান্নাঘরেই সাধারণত তার আহারের ব্যবস্থা করা হয়। সেদিকে সে অগ্রসর হচ্ছিল; কিন্তু পদ্মশ্রী বলল, ওদিকে নয়, এদিকে এসো।

পদ্মশ্রীকে অনুসরণ করে সে পেছনের বারান্দায় এসে উপস্থিত হলো। এই প্রশস্ত বারান্দায় তিনটি আসন পাতা হয়েছে। প্রথমটি রুপাই, দ্বিতীয়টি অলক এবং তৃতীয়টি মানবের জন্য সাজানো হয়েছে। সে তার আসনের সামনে দাঁড়িয়ে থমকে গেল। আহারের ব্যবস্থা, ব্যঞ্জনাদির বাটি দেখে সে খুশি হলেও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। দুপুরের চেয়ে রাতের সুসজ্জিত আয়োজন একেবারে রাজকীয়।

রুপাই বলল, দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসে পড়ো।

মানব দৃঢ় কণ্ঠে বলল, একটা ষড়যন্ত্রের আভাস যেন পাচ্ছি।

অলক চটপট উত্তর দিলো, আসলে তা নয়। আপনি আসার বদৌলতে আজ ভালো ভালো খেতে পারব।

ভাতে হাত দিতে দিতে মানব বলল, কিন্তু পরিশ্রম বেশি।

রুপাই বলল, পরিশ্রম হলে পেট ভরে খেতে হবে, লজ্জা করার কোনো কারণ নেই।

মানব বলল, আজ্ঞে।

পদ্মশ্রী আহারের তদবির করতে করতে তারল্যের সঙ্গে মৃদু মৃদু হাসতে লাগল।

তারপর কোনো কথাই কেউ বলল না। মাঝখানে পদ্মশ্রীর প্রশ্নের উত্তরে কেবল মাথানাড়াল মানব, জানাল ভাত এবং ব্যঞ্জনাদি কোনোটিই সে চায় না।

আহারাদির পর বাতি নিবিয়ে শুইয়ে পড়ে মানব। সুশীতল আর সুশোভন স্মৃতির হৃদয়-মাধুর্য তাকে বিভোর করে রাখল। হঠাৎ তার বুক দুরু দুরু করে উঠল। প্রাণপণে উৎকর্ণ হয়ে সে শয্যার ওপর উঠে বসল। স্মৃতির চিন্তায় তার অন্তর কল্লোলিত। মহাবেগে মথিত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর থেকে, একটিবারের জন্য স্মৃতির দেখা পায়নি মানব; আহারের সময়ও সে একটিবারের জন্যও রান্নাঘর ত্যাগ করেনি। সেখান থেকেই আহারের তদবির করেছিল। মানবের কানে একটি শব্দ এলো। পদশব্দ। দরজার দিকে চোখ নির্ণিমেষ হয়ে রইল। মানবের মনে তৎক্ষণাৎই জন্মিল স্মৃতিই আসেছে। আর কেউ নয়, মনের প্রতিধ্বনিও নয়, ভ্রম তো অবশ্যই নয় সে-ই আসেছে। স্মৃতি তার কাছে যেন উর্বশী- চির মনোরমা, চির অনুপমা। সকল প্রেরণার মূল, সকল প্রাপ্তির শ্রেষ্ঠসম্ভার। এই সর্তক পদধ্বনি তারই। মানবের উৎক্ষিপ্ত আত্মা মূর্ছাহত হয়ে তাকে গ্রহণ করবে। ঠিক তখনই রুপাই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, মানব ঘুমিয়ে পড়েছ?

মানবের কণ্ঠ¯^র একটু বিলম্বে ফুটল, বলল, না, কেন? তারপর জিজ্ঞেস করল, চোরের মতো এতো নিঃশব্দে এলে যে?

ভাবেছিলাম, তুমি ঘুমিয়ে হয়তো পড়েছ; তাই আমার আস্তে আস্তে আগমন।

দরজার ছিটকিনিটা খোলে দিলো মানব।

রুপাই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আজ দুই বন্ধু একসঙ্গে থাকব। স্মৃতিকে বলে এসে সে যেন ছিটকিনি তুলে দেয়। মানব এই বাড়ির কুটুম। ওকে তো একা একা রাত কাটাতে দেওয়া যায় না।

ভালোই হলো।

মানবের খাটেই রুপাই স্থান করে নিলো; কিন্তু কোনো কথা বিনিময় হলো না। রুপাইয়ের এই রাত কাটানোর জন্য আগমন মানব শুইয়ে শুইয়েই সামাল দিলো। নিষ্পলক চোখদুটি যেদিকে যায় সেদিকেই কেবল অন্ধাকার। আলোকশূন্য এবং নিষ্প্রাণ অন্ধকার। অসাড় প্রাণের অন্ধকার। এই অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে মানব মনে মনে বলল, আমাকে আবার পালাতে হবে। সে যেন রুপাইয়ের এরকম ব্যবহারে বিভ্রম হতে লাগল। এমন বিভ্রমের মধ্যেও মানবের একটু হাসি পেল। গতবার পালিয়েছিল আতঙ্কতাড়িত হয়ে রুপাইয়ের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা আর এবার পালাতে চায় দোটানায় বিপন্ন মানব নিজের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য। মানব একটি অসহায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। দূর থেকে স্মৃতির আহলাদের পরম উল্লাসকর প্রাপ্তির পুলকে তার অঙ্গ শিহরিত হলো। এবং তার জগৎ যেন পূর্ণিমার চন্দ্রালোর মতো সুনির্মল ভালোবাসায় প্লাবিত হতে লাগল। নশ্বরত্ব বাদ দিয়ে নিরবয়ব এবং নিরুত্তেজক ভালোবাসার জন্য যেন তার অন্তরাত্মা ছটপট করতে লাগল। রুপাই পাশে থাকা সত্তে¡ও সে নিজেকে ভীষণ একা মনে করছে। অন্যদিকে, স্মৃতিও একা। দুই ঘরের ব্যবধান অতিঅল্প; কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা অসংকীর্ণ। ইচ্ছে করলেও ভাগ করে নেওয়া যায় না। তাই ক্রোধের শিবতাণ্ডব আর যন্ত্রণা চলতে লাগল তার হৃদয়ে। এবং অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আবর্তিত হতে লাগল তার মস্তিকে। আর চোখে নিদ্রার নামগন্ধ নেই। হয়তো-বা কিছুক্ষণ পর- যখন রাত্রি শেষ হওয়ার পথে- দুচোখ ভেঙে ঘুম আসবে। আশ্চার্যই বটে, রুপাইয়ের নাকে কাঁকর পিষে রথ চলতে লাগল, যদিও মানবের মন ও মগজ অগ্নিতপ্ত, তবুও তার ঘুম পেল।

বেলা করেই মানবের ঘুম ভাঙল। ইচ্ছে করে নয়, পদ্মশ্রীর ডাকেই তার ঘুম ভাঙল। তার মনে এমন বিতৃষ্ণা আর আলস্য যে, চোখ খুলে তাকাতেই ইচ্ছে করছে না। পদ্মশ্রী মুড়কি এবং চিড়ে-দই এনে মানবের বিছানার পাশে একটি টুলের ওপর রাখল। তার দিকে তাকিয়ে তিক্ততা- অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোর তিক্ততা- মানব অনুভব করল। চিড়ে-দই বড়ো লোভনীয় মনে হলো। তাছাড়া নারিকেলের মিষ্টান্ন; ছাঁচে ফেলে বিবিধ আকারের চালের পিঠা- কোনোটা পানপাতার মতো, কোনোটা চিড়িতনের টেক্কার মতো, কোনোটা চুর্ভূজ; আর চায়ের পেয়ালাটি স্থান করে নিয়েছে এই ছোটো টুলেই। তারপরও হাতমুখ ধুয়ে এসে চিড়ে-দই খেতে বসল। আর ভাবতে লাগল রুপাইয়ের কথা- সে অনেক আগেই মাঠে চলে গেছে- রুপাই ভাগ্যবানই বটে। অপরূপ নারীরতন তা আছে। সেই আনন্দেই দিনদিন তার প্রতিকর্মে উন্নতি ঘটছে। ঘটবেই না কেন! তার হৃদয়পুটে যে উদবেগহীন অনিন্দ্য রূপের একাপিত্য- স্বর্গ। এই ¯^র্গ থেকে সে অনাবিল মধু অহরহ গ্রহণ করছে। কিন্তু রুপাই অতিশয় নির্লজ্জ, অভদ্র এবং অনেক ন্যক্কারজনক দোষের আধার। তা না হলে গতরাতে এমনটা ঘটাতে পারত না। স্ত্রীকে একা রেখে বন্ধুকে সঙ্গ দেওয়ার অজুহাতে আমার সঙ্গেই রাত কাটানোর দুঃসাহস প্রকাশ করল। এমন যে করতে পারে তার প্রতি কোনো মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা অনুচিত। সে যা করেছে তা অমানুষের অসাধ্য দুষ্কার্য। যার ঘরে সুন্দরী স্ত্রী আছে- তার এই সুখের অংশ আমি  স্বীকার করি- সে কীভাবে পারল স্ত্রীকে একা একা রাত কাটাতে। অত্যন্ত লম্পট আর জঘন্য ব্যক্তি না হলে এমনটা করতে পারে না। রুপাইয়ের বেপরোয়া স্বরূপ আমার কাছে অনাবৃত হয়ে গেছে। সে মানুষ নয়। অত্যাচারী। ভণ্ড কুৎসিত ব্যক্তি। মানবের হৃদয় এখন ক্ষতবিক্ষত, এবং পুড়ে ছাই হতে লাগল। এই আহত অন্তরেই বলে উঠল, পদ্মশ্রী?

কী দাদা!

তুমি কখন তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার চিন্তা করছ?

এখনো চিন্তা করিনি, দাদা।

চিন্তা করে দেখো। তুমি চাইলে আমার সঙ্গে তোমাকে নিয়ে যেতে পারি।

বৌদিকে জিজ্ঞেস করে দেখি।

সে এখন কোথায়?

পাশের বাড়িতে গেছে।

বাইরের রৌদ্র চঞ্চল হতে লাগল। মানব দরজার ফাঁকে নয়নতারা ফুলের গাছটি একরার দেখে নিল। বাতাসে পাতাগুলো দোলা খাচ্ছে। গাছটির নিচে সমস্তটাই ছায়াময়- চঞ্চলালোকবর্জিত স্থির ছায়া। তারই পাশ দিয়ে রুপাই তার ঘরে ঢুকল। স্মৃতিকে না পেয়ে অলককে ডাকতে লাগল। অলক কাছে আসতেই জানতে চাইল, স্মৃতি কোথায়?

অণিমা মাসির বাড়িতে গেছে।

কখন গেছে?

একটু আগে।

সঙ্গে কে গেছে।

একাই গেছে।

অলকের কথা শুনে রুপাই খুবই অবাক হলো। বলল, কিন্তু তুই জানিস না, সে একা একা কোথায় যাক তা পছন্দ করি না। তুই বাড়িতে থাকতে সে একা গেল কেন?

বৌদির সঙ্গে যে আমাকে যেতে হবে তা বুঝতে পারিনি।

বুঝবি কি করে? আমি ভোর থেকে ক্ষেতখামারে পড়ে থাকি আর তুই ঘরে থেকেও দায়িত্ব পালন করতে পারিস না। মানসম্মান ধরে রাখতে হয়, বুঝলি!

রুপাইয়েরর কথা শুনে অলকের মনে হলো হয়তো সে কিছু অন্যায় করে বসেছে। তাই বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।

শোন অলক, লোকের মুখে অনেক কিছু শুনতে হয় আমাকে। ঘরে যখন জ্বলন্ত আগুন তখন সাবধানে থাকতে হয়।

অলক ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, কে কি বলেছে, আমাকে বলো, তার ঘাড় ভেঙে দেবো।

সেসবে কোনো কাজ নেই। সোজা কথা হচ্ছে, তোর বৌদিকে একা একা কোথাও যেতে দিবি না।

আমি বৌদিকে মায়ের মতো সম্মান করি। ওর সম্বন্ধে কেউ কিছু বললে আমি সহ্য করব না।

কতটা তোর সাহস তা আমার জানা আছে। বাহাদুরি রাখ। এ আমার কাছে খুবই অপছন্দ।

বাহাদুরি নয়, বরং হীনতাকে সুস্থিরে সহ্য করে নেওয়াই আমার জন্য অপছন্দের বিষয়।

শোন, জীবনে কিছুটা কষ্ট, কিছুটা আনন্দ, কিছুটা হীন, কিছুটা সামান্য, কিছুটা অসামান্য নিয়ে বাঁচতে। আমি সারাদিন গাধার খাটুনি করি, শুধু তোদের সুখের জন্য।

রুপাইয়ের কথাগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে অলক বলল, জানি, পিতার চেয়েও দশগুণ হৃদয়বান তুমি। তুমি সবার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম করো। কিন্তু আমার মিনতি, তুমি এত খেটো না। মধুরতম তোমাদের এই সময়টাকে সশ্রমদণ্ডে দণ্ডিত করো না। তোমাকে দিনদিন বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তুমি বৌদিকে সময় দাও। সে তোমাকে খুব ভালোবাসে।

এত বখবখ করিস না তো। দ্যাখ, তোর বৌদি এখনো ফিরে আসেনি কেন? আমার সঙ্গে বখবখ না করে বরং ওকে খোঁজে বের কর।

অলক ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার পাশে স্মৃতির পাদুটি দেখে বলল, তুমি কোনো চিন্তা করো না। সে এখনই ফিরে আসবে। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি।

রুপাই বিস্মিত হয়ে বলল, কোথায়, কেউ তো আসেনি!

রুপাইয়ের এই সবিস্ময় অস্বীকারে মনের একটা ভাবান্তর তৎক্ষণাৎ ঘটল; এবং ভাবান্তর ঘটল দেখে অলক বিস্মিতই হলো। মনটা তিরতির করতে লাগল।

স্মৃতি কিছুক্ষণ ধরেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রুপাইয়ের কথা শোনছিল। স্বামীর কথাগুলো শুনেই অভিমানে ওর শরীর কাঁপছিল। অলক চলে গেলে ঘরে প্রবেশ করল স্মৃতি। তবুও বুঝতে দিলো না তার ভেতরে এক ভীষণ ব্যথা ক্রমে তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। বুঝতে দিলো না সে আজ প্রথম পাগলের মতো একটি সন্তানের জন্য সাধুবাবার দিকে হাত বাড়িয়েছে। সে খাটে বসতে বসতে রুপাইয়ের উদ্দেশে আড়ষ্ট গলায় বলে উঠল, কীসের এত ঝামেলা? তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলে যে! তোমার শরীর খারাপ নাকি?

রুপাই চমকে উঠল। বলল, এতক্ষণে ফিরলে তাহলে! কোথায় ছিলে?

অণিমা মাসির বাড়ি। আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না যে!

রুপাই একটি দীঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বলল, কোন প্রশ্নের!

তোমার শরীর খারাপ নাকি?

অহ, না।

তাড়াতাড়ি ফিরে এসে ভালোই করেছে। চা খাবে?

চোখের ভাষা উদ্ধত অটল হয়ে যেন এক নিমেষেই যেন ক্রদ্ধ হয়ে গেল। এই ভাষা চোখে নিয়েই রুপাই বলল, না, আমাকে একটু পরেই বেরুতে হবে। ব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সকৌকুকে স্মৃতি বলল, আবার বাইরে যাবে মানে?

প্রয়োজন আছে, যেতেই হবে।

স্মৃতি নতচোখে খানিক নিঃশব্দ থেকে, রুপাইয়ের দিকে চোখ তুলে বলতে লাগল, তোমার মনের দিশে পাই না। তুমি যে কী চাও আর না-চাও তা এখন আমি বুঝতে পারি না। সবসময়ই একটা-না-একটা বাহানা তুমি…।

সংশয়ের সঙ্গে রুপাই বলল, প্রত্যেক পুরুষেরই একটা জীবন আছে। সমাজ আছে। সেই মতো তাকে চলতে হয়।

স্মৃতি একটু নড়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, প্রত্যেক নারীরও আছে। আমি তোমাকে থাকার জন্য বলছি না। আমার যা যা প্রয়োজন সবই এখানে আছে। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, ক্ষেত ভার শাকসবজি, গোয়াল ভরা দুধ- সবই আমার পেট ভরার জন্য আছে। তোমার ভাই, তার স্ত্রী আছে আমাকে পাহারা দেওয়ার জন্য। শুধু…।

সুখে শান্তিতে থাকতে হলে এর চেয়ে কীসের প্রয়োজন?

এ তোমার অহংকার। আসলে তুমি একটা স্বার্থপর মানুষ। তাই জানো না, তুমি আমার সঙ্গে থাকলে আমি কত আনন্দ পাই।

তোমার সঙ্গে তর্ক করার আমার ইচ্ছে নেই। আসি।

যাওয়ার আগে যা বলেছিলে তার উত্তর দিয়ে যাও।

রুপাই খানিক তার চোখের পলকপাতা বন্ধ রেখে বলল, তুমি কি আমার মনের কথা বোঝো না? কী চিন্তা করি, কী ভাবি তা বলার প্রয়োজন নেই! আমি ক্ষেতখামারে কঠোর পরিশ্রম করি; করণ, চাই তুমি সুখি থাকো। বাড়িতে বসে যা ইচ্ছে তা করো। বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একথা তো অনেকবার বলেছি আর নতুন করে বলার কি আছে!

স্মৃতি তার বুকের আগুন নেবাতেই হয়তো বলে উঠল, আমি শুধু এই বাড়িতে বন্দি থাকব! কিন্তু বাড়ি যদি হয় অন্ধকারের রাজপ্রসাদ।

সামধানে এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করে রুপাই একটি নিশ্বাস ছেড়ে বলল, তোমার অভিযোগ করার অধিকার আছে, তবে অপবাদ ঘাড়ে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

স্মৃতি রক্তবর্ণ চোখে সোজা রুপাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, অপবাদ? কীসের অপবাদ? তোমাকে আমি কোনোদিনই অপবাদ দিইনি। অপমানও করিনি। তোমাকে অমান্যও না। তোমার হুকুমই আমার শিরধার্য। মনের যত যন্ত্রণা আছে তা সংগোপনে হৃদয়েই রেখেছি। তোমাকে মুখ ফুটে কিছুই বলার আমার সাহস নেই।

আমি জানি আমার বিস্তর দোষ; তবে সংসারে আমি কোনো অশান্তি চাই না। চাই নিশ্চিতে ঘুমোতে।

কিন্তু আমি ঘুমোতে পারি না। চোখে নিদ আসে না।

কারণ, তুমি কিছু-একটা চাও। বলো, কথাটা সঠিক নয় কি?

হ্যাঁ, আমার কিছু একটার প্রয়োজন আছে।

আমি তা ভুলে থাকতে চাই।

আমি পারি না।

সবকিছু তো পাওয়া যায় না, স্মৃতি। বরং অলক ও পদ্মশ্রীর সন্তানকে যত্ন করে, ভালোবাসা দিয়ে আমাদের করে নেব।

আমি নিজের সন্তান চাই।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তোমার সঙ্গে আমাকেও ধ্বংস করে দিচ্ছ।

জানি, আমি কী! তোমাকে কোনোভাবেই ধ্বংস করছি না।

তুমি পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলো তা আমি চাই না। তারা আমাকে দোষারূপ করে। তাই ওদের সঙ্গে মেলামেশা করবে না।

পাড়াপ্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলা অন্যায় কিছু নয়।

কিন্তু…।

আবার কিন্তু!

আমি ওদের অপমান সহ্য করতে পারি না। তাই আমার নির্দেশ, আমার স্ত্রী হিসেবে তুমি আমার অসম্মান যাতে হয় তা করবে না।

স্ত্রী!

এই পরিবারের একটা সম্মান আছে। আমার মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তা রক্ষা করে চলব। আমাকে ক্ষমা করো।

আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, এ ব্যাপারে আর কোনো কথা নয়। এখানেই এই বিষয়ের সমাপ্তি ঘটুক।

ঠিক আছে। তা-ই হোক। আমি আসি।

যাও। তোমাকে ধরে রাখার আমি কে!

প্রকৃতি যেমন প্রলয়ের শেষে বাতাসের ভীষণ গুম গুম শব্দ হয়; আশ্চর্যভাবে জানালার ওপর দিয়ে দুলে দুলে চলে যায়; কিংবা কীটপতঙ্গ জলে ভেসে যেতে যেতে একটা দ্বীপে আটকা পড়ে; তেমনি নিশ্চুপে রুপাই চলে যাওয়ার পর স্মৃতির অবস্থা হলো। সে আর কিছু করার না পেয়ে খাটের ওপর বসে কাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

পদ্মশ্রী এসে সামনে দাঁড়াল। ওর মনের ভেতরে কষ্টের ঘোর জমে উঠেছে। বাইরটাও নিঃশব্দ কষ্টে গুম গুম করছে। ভারি গলায় পদ্মশ্রী বলল, বৌদি, তোমার কি হয়েছে? তোমাকে কেন মনমরা দেখায়? এমন দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।

চট করে হাত থেকে কাঁথাটি চাদরের ওপর রেখে স্মৃতি বলল, কষ্ট পাওয়ার কি আছে! কাঁথা সেলাই নিয়ে এখন ব্যস্ত, প্রাণভরে কথা বলার দুদণ্ড সময় নেই।

তোমার কাছে আমি কি কোনো অপরাধ করিছি?

স্মৃতির মনে করুণা জন্মাল। তার মনে হলো, নিদারুণ উত্তপ্ত অন্তর্দাহে নিরপরাধ পদ্মশ্রীর সমস্ত সূত্র অনুভূতি যেন বিনষ্ট হয়ে গেছে- আর তা বোধ করেই স্মৃতি বলল, অপরাধ! আমার মতো একজন পরিত্যাক্ত নারীর সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।

পদ্মশ্রী আত্মনির্যাতন বোধ করে, যা তার অন্তরে জ্বলে উঠেছে- তার মনে হচ্ছে স্মৃতি একপ্রকার পাগলই- কতর কণ্ঠে বলল, এমনভাবে বলছ কেন?

ইচ্ছায় নয়, কোনোপ্রকার প্রলোভনে নয়, বরং আত্মক্লান্ত অনুশোচনা বুকে সঞ্জীবিত হয়ে স্মৃতি বলল, আমার মনের কথা কাকে বলব, আমি বড্ড ক্লান্ত। ক্লান্ত আমি মা না-হওয়ার চিন্তায়।

পদ্মশ্রীর শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। তার অন্তরে ছটফটানির অন্ত নেই। তার চোখের সামনে যেন দীপ্ত হয়ে উঠল স্মৃতির অগ্নিদগ্ধ নারীমূর্তিটি। এই বীভৎস চেহারাটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, তুমি এভাবে কথা বলো তা আমি চাই না।

শুষ্ককণ্ঠে স্মৃতি বলল, আমার মতো যারা মা হওয়ার ভাগ্য নেই, তাদের কথা তুমি বুঝবে না।

পদ্মশ্রী চুপ হয়ে গেল; কিন্তু তার বিস্ময়ের অবধি রইল না- সে যেন এতদূর ভাবেনি। একটা নেতাৎ অন্যায় যেন সে অজান্তে করে বসেছে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এরকম চিন্তা করা তোমার উচিত নয়। তোমাকে আগেও বলেছি এখনো বলছি, একদিন তুমি মা হবেই। বিশ্বাস করো, একদিন…।

পদ্মশ্রীর কথা শেষ করতে না দিয়ে স্মৃতি বলল, একদিন! কিন্তু এই প্রতিদিনের চাই-চাই স্পৃহা আর সেইসঙ্গে না পাওয়ার অনুভূতি কেমন যেন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে আমার অন্তরে। আমি এক হতভাগিনী, ফুল হয়ে ফুটে উঠেছিলাম একমুহূর্তের জন্য আবার মাটিতে মিশে গেলাম এক নিমেষে। ¯^প্ন ভঙ্গ হলো। প্রতিমুহূর্তে শুধু অপমান সহ্য করে চলতে হচ্ছে। বুকের ভেতরে আশার আলো আছড়ে মরছে।

পদ্মশ্রী এ আবেগময় কথার জন্য যেন প্রস্তুত ছিল না। প্রস্তুত থাকলে, পরিহারের নয়, গ্রহণের উপায় চিন্তা করতে পারত। কিন্তু প্রস্তুত না থাকায় অতর্কিতে বাহুবেষ্টিত হয়ে আবেগের বেগ সম্বরণের চেষ্টায় মূঢ়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো কথা ফুটল না। চোখেও ফুটল না তার চিত্তোল্লাসের প্রতিবিম্ব। স্মৃতি বলে চলল, আজকাল মনে হয় আমার কোনো সুখদুঃখ নেই, সংসারের কোনো বোঝা নেই, ভেসে চলেছি শরতের মেঘের ভেলার মতো।

পদ্মশ্রী আর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। অবিচলিত স্মৃতির গলা জড়িয়ে ধরল। বলল, তোমার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। তোমাকে মনের কথা বোঝানোর প্রণালিও আমার জানা নেই। শুধু তোমাকে দেখে সন্তাপে প্রাণ পুড়ে যাচ্ছে।

স্মৃতির মুখে কোনো শব্দ নেই। গলা ছেড়ে হাত ধরে মুখোমুখি বসল পদ্মশ্রী। হাতটি নিজের বুকের কাছে তুলে নিয়ে বলল, যে আমাদের ঠাকুর তিনিই তোমাকে সন্তানহীন রেখে অপমান করছেন। তিনি সত্য হতে পারেন না। সত্য হলে কী তোমাকে নিষ্ঠুর পাষাণের মতো দুঃখের অতলে নিক্ষেপ করেছেন। তিনি যেন তোমাকে আঁধারে ঢেকে রেখেছেন।

পদ্মশ্রীর উত্তেজনা দেখে স্মৃতি অবাক হলো; কিন্তু প্রত্যুত্তর করল না। মাথা নত করেই বসে রইল। এই নত মাথাকে যত্ন করে পদ্মশ্রী তুলে ধরল। তাকে স্মৃতি বিমর্ষ হয়ে দেখতে লাগল। পদ্মশ্রী বলল, আমি আর ঠাকুরের সেবা করব না।

আঁতকে উঠল স্মৃতি। যতই তার অন্তরে সন্তানহীন যন্ত্রণা অনুভব করুক না কেন, ঠাকুরের প্রতি পদ্মশ্রীর ভ্রান্ত ধারণা অশোভন বলেই মনে করল। তার কাছে পদ্মশ্রীর কর্তব্যচ্যুতি ঘটেছে। সে যেন শিষ্টতার বিধি লক্সঘন করেছে। তাই কটাক্ষ করল, তুমি গৃহস্থ ঘরের বউ, ঠাকুরের সেবাই তোমার জীবনসাধনা, তার সেবাতেই সংসার হয়ে ওঠে সুখময়। তাই বলছি, পদ্মশ্রী এমন কথা আর কখনো বলবে না, পাপ হয়।

কিন্তু তোমার দুঃখ যে আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

আমাকে নিয়ে কষ্টবোধ করে ঠাকুরের সেবা করবে না তা হয় না। কিছুক্ষণ চক্ষু মুদিত করে স্মৃতি ঝিরঝিরে বাতাসে কিছুটা আরাম অনুভব করল। যেন হঠাৎই মনের যন্ত্রণা নির্বাপিত হলো। তারপর চোখ খোলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরের নিঃশব্দ আর প্রখরতর রোদ তার কাছে বেশ মোলায়েম মনে হলো। একসময় বাঁশের মাথায় মাথায় ঠেকাঠেকির তীক্ষ্ণ আহত আওয়াজ তার কানে আসতেই বলল, তাছাড়া ভাবতে শুরু করেছি যে, আমি এক বন্ধ্যা নারী।

তুমি বন্ধ্যা নও। হয়তো-বা দাদা!

হয়তো-বা।

তাহলে তাকে একবার ডাক্তারের পরামর্শ…।

ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার কথা স্পষ্ট কিংবা অশ্লীল হয়ে উঠার আগেই, হয়তো-বা এই প্রসঙ্গকে চাপা দেওয়ার চেষ্টায়- তবে রুপাইয়ের প্রতি অসন্তোষ গোপন না করেই স্মৃতি বক্রসুরে বলল, সে আজকাল মনে করে, আমি অন্য পুরুষকে ভালোবাসি। সে-ই যেন আমাকে মন্ত্র দিচ্ছে, একটা সন্তান লাভের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার জন্য। কিন্তু ওর কথা আমার কাছে পাতালবাসী অপদেবতার ইশারা বলেই মনে হয়। তোমার ভাসুর জানে না, যে নাম আমার হৃদয়ে আছে, তার দহনে আমার চিত্তের গহনে অগুন জ্বলছে। আমি শুধু তার মাধ্যমেই মা হতে চাই। একটি শিশুর মা-ডাক শুনতে চাই।

আসলে দাদা তোমাকে খুব ভালোবাসে। জানো না, তুমি ছাড়া তার জীবন মরুভূমি!

পদ্মশ্রীর কথা হৃদয়ঙ্গম করতে স্মৃতির তিলার্ধ বিলম্ব হলো না। সে পদ্মশ্রীর দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতেই দেখতে পেল, তার বন্ধনমুক্ত ঢেউ খেলানো চুলে অনাবরত ঢেউ ভেঙে চলেছে কোমল বাতাসের পরম স্পর্শে। আর পদ্মশ্রী করুণনেত্রে তাকিয়ে আছে স্মৃতির দিকে। সেই চোখদুটিতে চোখ রেখে স্মৃতি বলল, তুমি হয়তো-বা অবগত আছ যে, আমি কুয়োতলে গেলেও সে আমাকে সন্দেহ করে। পাশের বাড়িতে যাওয়া-আসাও সে অপছন্দ করে। আর পারছি না! ইচ্ছে করে কুঠারাঘাতে নিজের ভবলীলা এখনই সাঙ্গ করে দিই।

পদ্মশ্রী গা-ঝেড়ে বলে উঠল, ছি, ছি, বৌদি। এমন কথা মুখে আনাও পাপ।

হুহু শব্দ করে একটু হেসে স্মৃতি বলল, পাপ! আমি বুঝি না কিছু। নিষ্ফলই আমার অস্তিত্ব। অনুতাপপূর্ণ অতৃপ্ত জীবন বহন করে চলেছি। পাপ! অযোগ্য নারীর মৃত্যুই মঙ্গল।

আমি ভূমিসাৎ হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে ধরে রাখতে আর পারছি না। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন আর রক্তের গতি স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। দয়া করে তুমি এমন কথা আর কখনো মুখে আর আনবে না। বলো আর আনবে না।

ঠিক আছে, আনব না। এখন বলো, অতিথির সেবায় অবহেলা হচ্ছে না তো?

বন্দুমাত্রও না। একটু আগেই দাদাকে জলখাবার দিয়ে এসেছি।

বেলা করেই বুঝি সে উঠেছিল।

হ্যাঁ।

এখন চলো দুপুরের রান্নার কাজটা সেরে ফেলি। দেরি হলে তোমার ভাসুর আবার কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসে, কে জানে!

অলক একটু আগেই এসে দাঁড়িয়েছিল স্মৃতির দরজার পাশে। এখন সে পাথরবৎ। স্মৃতির কথা শুনে সে আর নড়তে পারছে না। ঘরে প্রবেশ করে কি বলবে তা সে বুঝতে পারছিল না। শুধু মনে মনে বলল, এভাবেই বুঝি বৌদির ভেতরে ভেতরে অবগাহন আরম্ভ হয়েছে। অবগাহন আরম্ভ হলে মনে হয় সবকিছুই নিরর্থক, বিনিময়ে শুধু একটু ভালোবাসা, নির্জন ভালোবাসা, স্বামীর সঙ্গ পাওয়া। তার চেয়ে বেশি কিছু আশা করে না সে। তারপর নিজেকে শক্ত করে ঘরে প্রবেশ করে বলল, কি গো… সমস্ত বাড়ি তোলপার করে চায়ের কোনো সন্ধান পেলাম না। এখন দেখছি তোমার দুজন মিলে আড্ডা দিচ্ছ। তবে কি পদ্মশ্রীর শুধু বৌদির কাছেই মধুর হাড়ি?

অলকের কথা শুনে পদ্মশ্রী চমকে পিছন ফিরে তাকাল। তার ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মধুর হাড়ি তো বৌদির কাছেই আছে, সেকথা তো তোমার অজানা নয়।

শান্তকণ্ঠে স্মৃতি বলল, এমন সুন্দর স্বামী থাকতে, পদ্মশ্রী তোমার মন বসে না কেন ঘরে?

স্মৃতিকে কিছুক্ষণ স্তদ্ধ হয়ে জড়িয়ে ধরে রেখে বলল পদ্মশ্রী, বৌদির চরণেই আমার ঠাঁই। তাই তো তোমার কাছে ছুটে আসি।

অলক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই স্মৃতি বলে উঠল, পদ্মশ্রী, তুমি আমার বুকেই আছ সবসময়।

পদ্মশ্রীর দিকে আড়ে আড়ে তাকিয়ে স্মৃতির উদ্দেশে অলক বলল, সঙ্গে আমাকেও একটু আশ্রয় দিয়ো।

স্মৃতি বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে পদ্মশ্রীর হাতের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বলল, হায়-রে পাগল। অসময়ে জ্বালাতন করো না আর। ভুলে গেছ তুমি বাবা হতে চলেছ। মিষ্টি মুখ করানো কিন্তু এখনো বাকি।

সময় মতো সবই হবে বৌদি। একথা বলে ঘর থেকে এক লাফে বারান্দায় চলে এসো।

অলকের গমন পথের দিকে তাকিয়ে স্মৃতি বলল, হলেই ভালো।

বারান্দা থেকেই অলক বলল, হবে বৌদি, আমি ভীরু নই।

অলকের উদ্দেশে পদ্মশ্রী বলল, তুমি একটা অপদার্থ ভীরু কাপুরুষ। তোমার বীরত্ব আর জাহির করতে হবে না। যাও, যাও। অদৃশ্য হয়ে যাও। আর ঝামেলা করো না।

অলক বলল, ঠিক আছে আমি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি। তবে আমাকে চা দিতে ভুলো না যেন।

অলকের ¯^ভাব খুব একটু বিনীত না হলেও মিষ্টি ও মধুর, কথাবার্তায় আশ্চর্য সরল সহজ, সে আর কতটা বেহায়া হতে পারে। সে বেশ অস্বস্তিবোধ করতে করতেই বারান্দা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর পদ্মশ্রী বলল, বৌদি একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।

কী!

মাসিমা তোমাকে সন্ধ্যায় যেতে বলেছি।

এখনই গিয়ে বলো, আমি সন্ধ্যায় আসতে পারব না। রাত হবে।

ঠিক আছে।

স্মৃতি পরদার ফাঁকে দেখতে পেল, অণিমার বাড়িতে যাওয়ার পথে পদ্মশ্রীকে দেখে অলক এগিয়ে যাচ্ছে। অলক জানে, পদ্মশ্রী ভীতু মেয়ে। দিনের বেলাও নাকি বৃশ্চিক আস্তেধীরে তার হুল উঁচু করে থাকে। অলক বলল, শোনো।

পদ্মশ্রী জানতে চাইল, কী!

স্বর্গমর্ত্যকে স্বাক্ষী রেখে, জগতের সমস্ত কিছুর সীমানা পেরিয়ে, বলছি আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।

এই অসময়ে একথা কেন?

দুটো বিরল প্রেমের ভালোবাসা জানানোর জন্য বুঝি সময়-অসময় লাগে। দেখো, স্বর্গ আমাদের আশীর্বাদ দিচ্ছে।

আমি যে তোমার অযোগ্য। হৃদয় যা দিতে চায় তা দিতে সাহস হয় না, নিতেও কুণ্ঠিত।

নিষ্পাপ এক উচ্চারণ- ভালোবাসা। আমাকে একটি সন্তান উপহার দিচ্ছ বলে আমি কৃতজ্ঞ।

তোমাকেও ধন্যবাদ।

চিরঋণী হয়ে রইলাম।

থেকো সবসময়!

এইভাবেই তুমি আর আমি…।

তুমি না…।

এই বন্ধনকে জেনে নিয়ো সর্বান্তকরণে।

আমার হৃদয় তোমার বন্ধনে।

এখন আসি, বৌদি ঘরতে আমাদের দেখছে।

স্মৃতি ওদের মতো এতটা আনন্দিত হতে পারল না। সে বিস্মিত, উল্লসিতও। কিন্তু নিশ্চপে। বাইর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল স্মৃতি।

বিকেল। আহূত মানব সুসজ্জিত হয়ে আহ্বানের মর্যাদা রক্ষার্থেই এসে উপস্থিত হলো স্মৃতির ঘরে। সে অনেক ভেবেচিন্তে ও সুস্থচিত্তে ঠিক করেছে এই আমন্ত্রণ তাকে রক্ষা করা উচিত। জানালা দিয়ে রোদ ঘরে পড়ে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কেবল কী যেন একটা দুঃখ যেখানে রোদের অস্তিত্ব নেই সেখানে নিরন্তর বয়ে চলেছে; কিন্তু দরজার চৌকাঠের লতাপাতার চিত্রণ মনোরমভাবে আত্মপ্রকাশ করছে। সেদিকে মানবের চোখ পড়তেই তার মনে হলো পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর এবং বিশিষ্ট আর কি আছে! তখন বারবার স্মৃতির ছায়া তার শরীরের চারপাশে যেন খেলে বেড়াতে লাগল। পরদার পাশ থেকেই সে বলল, ভেতরে আসতে পারি।

এসো। বলে যেন স্মৃতি ব্যগ্রভাবে অভ্যাগতকে অভ্যর্থনা করল। সঙ্গে সঙ্গেই অসংকোচে মানব ঘরে প্রবেশ করল। স্মৃতির দিকে তার দৃষ্টি পড়তেই সে কিছুতেই নিঃসন্দেহ হতে পারল না, স্মৃতির এমন রূপ আগে কখনো দেখেছে কিনা। এই সেই রূপ, যে-রূপ সম্মুখে এলে চক্ষু রূপ দেখতে দেখতে মানুষটিকে না-দেখে রূপের দিকেই নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে থাকতে চায়। তাই হয়তো ব্যস্ততার কোনো কারণ নিহিত নেই মনে করেই মানব একটি অকম্পিত ভাব নিয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। স্মৃতি প্রফুল্ল মুখে এবং সাগ্রহে বলল, দাঁড়িয়ে রইলে যে। এসে বসো!

কণ্ঠস্বরে অকপট কোমলতার স্পর্শ পেয়ে মানব মুগ্ধ হয়ে গেল, বলল, এভাবেই ঠিক আছি।

বসো বলছি।

স্মৃতির স্নিগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মানব ভাবতে লাগল, এই অতুলনীয় প্রতিমার নির্দেশ অমান্য করা অসম্ভব। আসন গ্রহণ করার উদ্যম মনে হলেও তার পাদুটি যেন অগ্রসর হওয়ার অবসর হলো না। স্মৃতিই পাশে এসে তার ডানহাতটি খপ্ করে চেপে ধরল। বলল, এসো, বসবে।

স্মৃতি একপ্রকার টেনেই চেয়ারে নিয়ে বসিয়ে দিলো। বসতে বসতে মানব খুবই অবাক হলো, পূর্বের চেয়ে আজ- এই মুহূর্তে- ঘরের সকল আসবাবপত্র যেন প্রশস্ততা আর উচ্ছল সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে। যেন চাকচিক্য। চোখ ধাঁধানো মুহুর্মুহু ঠিকরে উঠেছে। পালঙ্কের বিস্তৃত শয্যা যেন ফুলকাটা দুধের ফেনার মতো ঢেউ কাটছে। পুরু তোষোক, বালিশ, চাদর ও ওয়াড়ের বাহারে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে; একবারের জন্য নয়, চিরকালের জন্য। কিন্তু মানব লাফিয়ে সেই বিছানায় পড়ল না। বলল, তুমিও বসো।

না, এখন বসব না। সারাদিন এই বিছানায় বসে কাঁথা সেলাই করতে হয় যে, মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে থাকালে ভারি আরাম পাই। স্মৃতি দাঁড়িয়ে থাকার কারণ দেখিয়েই দাঁড়িয়ে থাকল।

মানব বলল, তা বটে। তারপর সে গম্ভীর হয়ে বিষণ্ণসুরে বলল, রুপাইকে যে দেখছি না।

ওর জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ততক্ষণে না হয় তুমি একটু মিষ্টিমুখ করো। ওর কথা শুনলে হয়তো তোমার আর মিষ্টি মুখে দিতে ইচ্ছে হবে না। বসো একটু। এ ঘরে একা থাকতে সংকোচ করবে না তো। নাকি পদ্মশ্রীকে ডেকে পাঠাব!

না, প্রয়োজন হবে না।

তাহলে তুমি বসো। আমি শীঘ্রই আসছি।

সুকোমল নির্মল কণ্ঠে কথাগুলো বলে স্মৃতি দ্রুতপদে ঘর ত্যাগ করল। স্মৃতির প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই মানবে মনে উদয় হলো- কথাটা কি! শুনলে আহারে অরুচি জন্মবে, এমন কি কথা রুপায়ের থাকতে পারে। অমঙ্গলের অনিশ্চয়তায় মানবের বুকে একটু কাঁপনি দেখা দিলো। তারপর একমুহূর্তও কাটেনি, মনের কোণে একটু হাসি হাসি ভাব নিয়ে এবং চোখে বিদ্যুতের ঝলক লাগিয়ে রুপাই এসে উপস্থিত হলো।

তুমি তাহলে আজই চলে যাবে।

মানবের চোখদুটি যত অল্প সময়ের জন্যই হোক, নিষ্পলক তাকিয়ে রইল রুপায়ের মুখের দিকে। এই মুখেই যেন এমন কিছু বিপর্যায়ের ইঙ্গিত পেল, যা যন্ত্রণাভোগ করতে অনিচ্ছুক মানুষের অদৃষ্টে যত কম ঘটে ততই মঙ্গল। তাই হয়তো মানবের নাসিকা ও কর্ণযুগল সমেত সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করল। অন্তরে জ্বালা সৃষ্টি হলো। হৃৎপিণ্ডের অবস্থা হলো অবর্ণনীয়। শিরা আর উপশিরা দিয়ে জ্বলন্ত লাভার মতো রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। দেহাভ্যন্তরের এই ক্ষিপ্ত উদ্দাম পরিস্থিতিকেই সহ্য করতে করতে একরকম অচেতনভাবেই, দৃষ্টি রুপাইয়ের মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে নতচক্ষে বলল, একসময়-না-অন্যসময় বিদায় তো নিতেই হবে। তাই আর সময় ব্যয় না করে এখনই বিদায় নিতে চাই।

মানব উঠে দাঁড়ালে, এই ওঠা রুপাইয়ের মনঃপূত না হওয়ায়, হেসে আপত্তি প্রকাশ করল, বলল, উঠে দাঁড়ালে যে? আবারও পালাতে চাও?

মানব ধপ্ করে বসে পড়ল।

হ্যাঁ, বসো। তারপর মানবের পাশেই আরেকটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে ঈষৎ ভুরু কুঞ্চিত করে বলল, একবার পালিয়ে আমাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছ, আশা করি তা আবার করবে না।

রুপাইয়ের কথায় মানব আবার সংকটে পড়ে গেল। একটা অংকুশতাড়না তার মনে চলতে লাগল। সে রুপাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। তার সমস্ত উদ্যম আর অভীপ্সা যেন কল্পনাজগৎ হিসেবেই স্পষ্টতর মগজে জাগ্রত হয়ে উঠল। তাই হয়তো তার আনত দৃষ্টি আরও নত হয়ে গেল।

রুপাই বলতে লাগল, একবার পালিয়ে তুমি আমাকে আসামি করেছ; এবার পালাতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হব। স্মৃতি আবারও তোমার পালায়নের কারণ হিসেবে আমাকেই দায়ী করবে, সন্দেহ নেই। মনে রেখো, ওর বুদ্ধি তোমার ও আমার চেয়ে কম নয়; বরং বেশিই বটে।… তুমি এখনো আমার চোখে চোখ রাখতে পারছ না কেন? চোখ তুলো।

মানব নিষ্কম্প চোখ তুলে রুপাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। দৃষ্টি নিবিষ্ট হয়ে রইল। অমৃতে পূর্ণ হয়ে যেন উঠতে লাগল। রুপাই বলতে লাগল, তাকিয়ে থাকো। স্মৃতি বলে আমার চোখদুটি এত গভীর যে, সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। ওর স্থির থাকা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। তোমারও কি সেই মত?

তোমার স্ত্রী যখন বলেছে, তাহলে তা-ই সঠিক।

কিন্তু অস্থির হলো তো চলে না। একথা বলেই রুপাই এমন ভঙ্গিতে হাসতে লাগল যে, মানব রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। সেই মুহূর্তে রুপাই বলে উঠল, একটি আকর্ষণের লোভেই তো তুমি ফিরে এসেছিলে, তা নয় কি?

এই প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার জন্যই মানব জীবনের বাইরে একটি অন্ধকার কূপে নিজেকে বন্দি করে রাখতে চাইল। কিন্তু পারল না। মুখে ফুটল, হ্যাঁ।

অতি মনোহর অনুচ্চ একটু হাসির লহরি তুলে রুপাই বলল, সত্যি সত্যিই তার লোভে ফিরে এসেছিলে। কিন্তু আমি মোটেই পাহারা বসাতে রাজি নই। কুয়াশা কি অন্ধকার সৃষ্টিতেও নারাজ।

অতঃপর সে পালঙ্কের একটি বালিশ টেনে নিয়ে শুইয়ে পড়ল। রুপাইয়ের দিকে তাকিয়ে মানব দেখল, ওর শয়নভঙ্গি ¯^চ্ছন্দ কিন্তু শরীর ভীষণ ক্লান্ত; অনাবৃত সুগঠিত বাহুযুগল অত্যন্ত অলস; চোখদুটি শিথিল। কিন্তু মুখমণ্ডল অসহ্য রক্ত চাপে যেন টাটিয়ে উঠল।

স্মৃতি মিষ্টি ও চায়ের পেয়ালা থালায় করে দরজার সামনে আসতে রুপাইয়ের শেষ কথাগুলো তার অন্তরে এক অশ্বের দ্রুত খুরের শব্দ সৃষ্টি করল। শরীরেও কী যেন কী ঘটে গেল। এমন সে কোনোদিন অনুভব করেনি। কোথায় যেন একটি অথই পাথারে নিমজ্জিত দিশেহার স্মৃতি কয়েক মুহূর্ত নিজেরে কোনো অঙ্গকেই সঞ্চালিত করতে পারল না। চোখদুটিও জ্বালা করছে, কাঁপছে। হৃৎপিণ্ডের ভেতরের জোনাকি পোকাটি যেন মরে যেতে বসেছে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে বলল, চা ঠাণ্ডা হবে যাবে। এখনই তোমার মিষ্টিমুখ করো। তারপর চা খেতে খেতে দুই বন্ধু মন খুলে আলাপ আলোচনা করো।

রুপাই উঠে বসল। তার পাশে স্মৃতি খাটে পা ঝুলিয়ে বসে মনের সুখে যেন পদপল্লব দুটি দোলাতে লাগল। এই দোদুল্যমান অপরূপ শ্বেতপদ্ম দুটির দিকেই মানবে চোখ গিয়ে পড়ল।

মানবের দৃষ্টি অনুসরণ করেই স্মৃতি বলল, এসো, তোমরা একটু মিষ্টিমুখ করো।

রুপাই হাত বাড়িয়ে একটি মিষ্টি তুলে নিতে নিতে বলল, মানব তুমিও নাও। তুমি যাওয়ার আগে একবার আমার অনুরোধ রাখো। আমার ইচ্ছে তুমি পূর্ণ করো মানব।

ভারি চিন্তাশীল দেখাচ্ছে স্মৃতিকে। ব্যাকুল কাতর ¯^রে বলল, তুমি সত্যিই চলে যাচ্ছ?

মানবের সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ।

কী নির্মম কথা। এ কী শুধুই একটা তীব্র অভিমানের প্রতিক্রিয়া? নাকি সে ক্রমশই হৃদয়শূন্য হয়ে যাচ্ছে? হয়ে যাবে রুক্ষ নীরস আবেগ ভালোবাসা শূণ্য এক অকেজো প্রাণী? কিন্তু এই অবস্থার জন্য দায়ী কি কেবল সে? ভালোবাসাহীন এই মরুভূমিতে সে একা একা আর কত চলতে পারে? রুপাই এসব ভাবতে ভাবতেই বলে উঠল, যাওয়ার আগে সবগুলো মিষ্টি কিন্তু তোমাকে খেয়ে যেতে হবে।

স্মৃতির বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। এই পরিস্থিতিতে মানবের চলে যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিবাদ জানানো মানেই কেবল কথা বাড়ানো। মর্মে মর্মে সে উপলব্ধি করছে, মানব কোনোমতেই তার সিদ্ধান্ত পালটাবে না। তাই আরও সংক্ষেপে শুধাল, কখন যাবে?

এখান থেকে মুখ হেঁট করে চলে যাবে মানব? আর পিতার কাছে গিয়ে হারিয়ে যাবে? আর রুপাই নামের লোকটা মুচকি হেসে ভাববে, বোঝ, দায়িত্বের মজা বোঝ! না, মানবকে নিজের গ্রামে গিয়ে যদি মাথা উঁচু করে না দাঁড়াতে পারে, তাহলে জীবনটা ধিক। এখানে প্রতিনিয়ত যে একটা অদৃশ্য অপমানের জ্বালা হজম করে চলতে হচ্ছে তাকে, তার অবসান হওয়া আবশ্যক। তাই হয়তো মানব বলে উঠল, যত শীঘ্র ততই উত্তম।

মানবের চলে যাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে স্মৃতির কাছে তার আঁটসাঁট সংসারটি যেন অনুজ্জ্বল হয়ে উঠল। তবু পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়ে উপায় কী? মানববিহীন জীবনটা ছবি মনে মনে আঁকতে থাকে। আঁকতে গিয়েই হঠাৎ বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। সন্তর্পণে হাত রাখে বিছানার চাদরে। আবেদনের দৈন্য নিয়েই সে বলে উঠল, হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? আমাদের বিরুদ্ধে তোমার কোনো অভিযোগ রয়েছে নাকি?

মানব মনে মনে একটু বঙ্কিম হাসি হাসল। কোঁকড়ানো চুলে ঘেরা মুখির পেশি একটুও না নাড়িয়ে, আর সৌজনের দৃষ্টি এদিক ওদিন না করে, কোমল গলায় বলল, এমন কেন বলছ!

স্মৃতি উদ্বেলিত গলায় বলল, বা-রে, তুমি চলে যাচ্ছ। কিন্তু ভুলে গেছ এ বাড়িতে তোমার একটি বোন আছে। তাকে দেখার জন্য মনে হচ্ছে তুমি আর আসবে না। তাই মনে হলো আমাদের বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগ আছে!

স্মৃতি তো ঠিকই বলছে! রুপাই বলল।

মানব তার অসাধারণ শক্তির বলে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, না, না। এমন ভাবা উচিত নয়। সময় ও সুযোগ পেলেই আমি আসব। তবে মনে রেখো, বাবা এখন বুড়ো, তার দেখাশোনার দায়িত্ব আমাকেই নেওয়া উচিত। তাছাড়া তার ক্ষেতখামারের দেখাশোনা করাও আমার উচিত।

রুপাই ঝোঁকের মাথায় বলে উঠল, আর কত তুমি অন্যের জমিতে ফসল ফলাবে?

রুপাইয়ের কথা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে হেসে, তারপর অন্যমনাভাবে বলল, সব জমিই এক।

রুপাই একটু চকিত হলো। আবার তেমনি গাঢ় গলায় বলল, না, একটা হচ্ছে নিজের আর অন্যটা পরের।

মানব হঠাৎ একটা দুঃসাহসের পাখায় ভর করে দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠল, আমার কাছে সবই সমান। সব জমিকে যত্ন করলে সমান ফসল পাওয়া যায়।

স্মৃতি অসহায়ভাবে কৈফিয়ৎ দিলো, পুরুষের জন্য হয়তো-বা সবই সমান, কিন্তু নারীর জন্য তা নয়।

মানব তার ¯^ভাবসিদ্ধ অতি তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসি হেসে বলল, হয়তো-বা নয়।

রুপাই জানে, ওর ও মানবের প্রকৃতি আলাদা। এই বিরোধিতার মধ্যে আলাপ টেনে যাওয়া অর্থহীন। আবেগ উদ্দীপ্ত গলায় বলল, তোমাকে ভালোবাসি মানব, আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া তোমার উচিত নয়।

মানবের মনে হলো, আর কতক্ষণ এই ভাবালুতা সহ্য করা যায়, একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, আমিও তোমাদের ভালোবাসি। এখানে আমার থাকাটাও জরুরি; কিন্তু জীবন পরিবর্তনশীল।

রুপাই গম্ভীর হয়ে যায়। মনে বেশ কষ্ট পাচ্ছে। হঠাৎ রুপাইয়ের সামনে সমস্ত পরিবেশটা ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। একটা অগাত শূন্যতায় যেন সে তলিয়ে যাচ্ছে। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, আবার কিছু কিছু জিনিস আছে যার পরিবর্তন ঘটে না।

স্মৃতির মুখ এখনো কৈশোরকালের মতো লাবণ্যময়, চুলের থাক এখনো রেশম কোমল। এ অবশ্যই স্মৃতির সৃষ্টিকর্তার দাক্ষিণ্য। রেশম কোমল চুলে হাত বোলাতে বোলাতে সে গভীর হয়ে গিয়ে বলল, ঠিকই বলেছ। যেমন কুয়োর তলে নিশ্চিুপে যার বাস সে তো বদলায় না। শুধু তার চিৎকার শুনে হয়তো-বা মনে হতে পারে, সে বদলাচ্ছে।

মানব খুব দৃঢ় গলায় বলতে চেষ্টা করল, এই তো প্রকৃতির নিয়ম।

সঙ্গে সঙ্গেই রুপাই বলে উঠল, অপ্রাকৃতিক প্রকৃতি বলেও তো একটা নিয়ম থাকতে পারে।

মানব মাথাটা একটু নিচু করে। তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে বলল, হয়তো-বা; তবে আমরা প্রকৃতির নিয়মেই বাঁধা। রুপাই তুমি ভালো করেই জানো, ঘর আর কৃষাণী, ফসল আর কৃষক, ক্ষেত আর লাঙাল, আকাশ আর চাঁদ- এই প্রকৃতির নিয়মেই চলে। পদ্মশ্রী ও অলকের সন্তানের আগমণে তোমাদের জীবন আনন্দে ভরে উঠুক এই আমার কামনা।

স্মৃতির মধ্যে হঠাৎ একটা অসহ্য ছটফটানি শুরু হয়। ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে বলে উঠতে, সে আসে তারই ঘরে, যে চায় তাকে। কিন্তু পারল না। বরং রুপাই বলে উঠল, ওর জন্য নূতন করেই সংসার সাজাতে হবে।

স্মৃতির চোখে যেন একটুকরো আগুন জ্বলে ওঠে। ক্ষণিকের জন্যই। সেদিকে তাকিয়ে গভীর গলায় মানব বলল, এই সংসার বিশাল, নূতন করে সাজাতে চাইলে তাও করা যায়। অভাব পূর্ণ করার বাসনা থাকলে সবই সম্ভব।

আশ্চর্য এক মায়া অথবা ভালোবাসা কীভাবে যে গড়ে উঠল মানবের মনে তা সে নিজেই জানে না। মানব পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলোটা জানালার ফাঁকে দেখতে লাগল। এই আলোকে অনুসরণ করে সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার পাদুটি যেন অবশ হতে লাগল। সে এই অবশ পাদুটিকে চাবুক মেরে যেন জাগাতে চাইল। একসময় পাদুটি সতেজ হতেই কোনো কথা আর বিনিময় না করেই বেরিয়ে পড়ল। স্মৃতি বুঝতে পারল কোথায় যেন কিছু-একটা হারিয়ে গেল। মানবকে আর দেখা গেল না। মানবের এই নিঃশব্দে চলে যাওয়া রুপাই নিজেই কেমন যেন অবাক হয়ে গেল।

রাত্রি গভীর হয়নি। শুধু সন্ধ্যা গড়িয়ে ঘন হয়েছে মাত্র। পদ্মশ্রী ছুটে এসে স্মৃতিকে বলল, বৌদি তাড়াতাড়ি করো। মাসিমা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। শীঘ্রই চলো।

রুপাই একথা শুনেও নিজেকে সামলে নিল। নিজের জন্য এবং স্মৃতির জন্যও। স্মৃতির মনে যেন আর কোনো সংশয় না হয়। বলল, যাও, তবে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

এখন স্মৃতি একটি ব্যস্ততার প্রতিমূর্তি। স্মৃতি আর পেছন ফিরে তাকাতে চায় না। সামনেটা ছাড়া আর কিছু যেন দেখার নেই। সন্তান সাধনে অনবদ্য। স্মৃতির ধারণা সাধুবাবাই তার সাফল্যের এক চাবিকাটি। সন্তান লাভে এক মূলধন। সে যেতে যেতে রুপাইকে বলল, তুমি চিন্তা করো না। পদ্মশ্রী তো সঙ্গেই আছে। ঘুমিয়ে পড়ো। অলককে বলে যাচ্ছি সে দরজা খোলে দেবে।

অণিমার সঙ্গে স্মৃতি যখন সাধুবাবার আশ্রমে এসে উপস্থিত হলো তখন তার অন্তরে কেমন যেন একটা রহস্য জেগে উঠল। অথবা শিহরন। তার চোখের ভেতরে কেমন রহস্য ঘুরে বেড়াচ্ছে অথবা তার মনের ভেতরে কী খেলা করছে তা দেখার জন্য যেন অণিমা তাকালেন স্মৃতির মুখের দিকে। অণিমা তার অনুভূতি, অভিপ্রায় ধরতে না পারায় হয়তো-বা স্মৃতি বলে উঠল, সেই কথাই ভালো, সাধুবাবা মন্ত্র জানে, মন্ত্র পড়েই আমাকে একটা সন্তান এনে দিক।

অণিমা ওর চোখের দিকে তাকালেন। চোখদুটি কালো ও গভীর বলে অভিব্যক্তির রেখাটা সহজে বোঝা যায় না। কিন্তু স্মৃতির ঘাড়ে কী দুঃসাহসের ভূত চেপেছে? অণিমার মুখটাও হঠাৎ ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। তিনি হঠাৎ তার থাবার মধ্যে স্মৃতির একটি হাত নিয়ে গভীরভাবে একটা চাপ দিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, কী বলছ তুমি! মন্ত্রের কথা শুনলেই আমার বুক কেঁপে ওঠে। ঘুমন্ত বাঘকে জাগিয়ে তোলো না বড়ো বউমা।

কিন্তু স্মৃতি এই মুহূর্তে সন্তান লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। শুধাল, কেন?

অণিমার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। এই মশাল জ্বালানো পরিবেশের মধ্যেও চোখে অন্ধকার দেখেন। খুব অস্ফুটে বললেন, শাপ লাগবে।

স্মৃতির উদবেলিত প্রত্যাশার ওপর যেন ঠাণ্ডা জল পড়ে। ঈষৎ সুরমা লাগানোর মতো চোখদুটি তুলে স্মৃতি বলল, জন্ম থেকেই তো শাপ পিছু লেগে আছে আমার। এক শাপের বিষে না হয়, অন্য শাপের বিষ নষ্ট হোক। আমার চিন্তার কোনো কারণ নেই!

সাধুবাবা মাটিতে তার লাঠি ঠুকে, বজ্র নির্ঘোষে একদম তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললেন, শোনো তোমরা, আমার মন্ত্র জীবসৃষ্টির সেই আদি অন্তকালের। কাঁচা নয়। এই মন্ত্র শাপমন্ত্রেরও গাঁঠ খুলে।

স্মৃতির বুকটা কেঁপে ওঠে। বুক কাঁপলে সাধুবাবার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠল, পড়ো সাধুবাবা, পড়ো তোমার মন্ত্র।

সাধুবাবা খুব অমায়িক গলায় বলে উঠলেন, কী অসীম সাহস তোমার!

স্মৃতি দুই আঙুল দিয়ে কপালটা টিপে ধরে একটুক্ষণ থেকে নিশ্বাস ফেলে বলল, আমার সাহসের কী দেখলে সাধুবাবা। বুকের ওপর যে ব্যথা চেপে আছে, তাকে সরাতে চাই তোমার নিষ্ঠুর মন্ত্র দিয়ে।

সাধুবাবা খুব নিরীহভাবে বললেন, তোমার অনুরোধেই এগিয়ে চললাম। হে ভগবান- অপরাধের শক্তি যত ক্ষমার শক্তি তোমার আরও অনেকগুণ বেশি। তোমাকে অসম্মান করার ক্ষমতা আমার নেই, তাই প্রণাম। প্রণাম। প্রণাম।

স্মৃতি স্বভাবছাড়া কাতর গলায় বলল, পড়ো তোমার নিষ্ঠুর মন্ত্র সাধুবাবা।

স্মৃতিকে কুটিল সংসারের বিষবাষ্প থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রয়াসে, চোখ বুজে, খুব কঠিন কিন্তু শীতল গলায় সাধুবাবা সীমানা ছাড়িয়ে অসাধ্য সাধনা শুরু করে দিলেন। জপতে লাগলেন, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদগি গরিয়সী \  নিষেকাদ্ বৈজিকং চৈনো গার্ভিকং চাপমৃজ্যতে। ক্ষেত্রসংস্কার সিদ্ধিশ্চ গর্ভাধানফলং স্মৃতম্ \  গর্ভং ধেহি সেনাবালি গর্ভং ধেহি প্রথুষ টুকে। গর্ভং তে অশ্বিনী দেবাবাধাতাং পুষ্কর স্রজৌ \  আর ভাবনা নেই তোমার। এই নাও মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল। পান করো। যেটুকু থাকবে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটু একটু গঙ্গাজল খেয়ে নেবে। এখন মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল পান করে মায়াদর্পণ হাতে নাচতে হবে।

অণিমা শঙ্কিতভাবে শুধালেন, কেন আমার বড়ো বউমাকে নাচতে হবে?

সাধুবাবা আস্তে আস্তে বললেন, শাস্ত্রে বলে নারী যখন আমার মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল খেয়ে এই মায়াদর্পণ হাতে নিয়ে নাচবে তখন সে অন্তঃসত্তা হবে।

অণিমা কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, অদ্ভুত শাস্ত্র তোমার সাধুবাবা।

গঙ্গাজল পান করে ভেতরে ভেতরে ভীষণ উত্তেজিত হয়। এই গঙ্গাজলই কী সত্যি তার নূতন জীবনদান করবে? নিঃসন্তান স্মৃতি তার হৃদয়ের সঞ্চিত বাৎসল্য স্নেহ তাহলে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। আহলাদে উচ্ছসিত হচ্ছে সে। বলল, আমার বুক দুরুদুরু করছে মাসিমা। আত্মা যেন ফেনিয়ে উঠছে। টলছে যেন আমার অন্তরাত্ম।

সন্তানবঞ্চিত স্মৃতির উদ্দেশে সাধুবাবা ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, এইবার তুমি মায়দর্পণ হাতে নাচো দেখি বাছা। দেখো দেখি, কী ছায়া পড়ল?

স্মৃতি অধীর- এতটা দিন ধৈর্য ধরে ছিল কি করে তবে? কেন চিৎকার করে বলতে পারেনি- আমি মা হতে পারি। অনিশ্চয়তার এমন ভয়ংক মাধুর্য আর কোথায় আছে, সাধাবাবার মন্ত্রছাড়া ছাড়া। সে বলে উঠল, কী নিষ্ঠুর তোমার মন্ত্র সাধুবাবা! কী কঠিন তোমার আদেশ। তবুও দুর্বল হব না; হব না আমি।

সাধুবাবা ঈষৎ আশ্বাসের সুরে বললেন, এইবার পড়ছি আমার মায়ামন্ত্র। আর দেরি নয়! মায়াময় ঐক্যতানে, গভীর অতল থেকে, আমার মন্ত্রে ওঠে এসো সূত্রদেহধারী আত্মা। দেরি করো না, আমার শক্তি হয়ে যাচ্ছে ক্ষয়।… চুপ, নীরব সকলে, না হলে নষ্ট হয়ে যাবে আমার মায়ামন্ত্র।

স্মৃতিকে যেন এক স্বপ্ন দুর্নিবার বেগে আকর্ষণ করছে। সে ক্লান্ত। ক্লান্তময় কণ্ঠে বলে উঠল, কী ক্লান্তি! নিস্তেজ করে দিচ্ছে আমার দেহকে!

সাধুবাবা এবার তার সাফল্যে বলে উঠলেন, ধন-মান-সুখের সংসার যেন হয় তোমার; সারা জীবন যেন সন্তানমুক্তা ঝরিয়ে চলো- এই আমার আশীর্বাদ। জয় হোক তোমার। জয় হোক কল্যাণীর।

স্মৃতিকে নিয়ে সাধুবাবার আশ্রম ত্যাগ করতে করতে অণিমা বললেন, কল্যাণ হোক তবে তোমার সাধুবাবা। তোমার মন্ত্রে যেন আমার বড়ো বউমার সন্তানের অভাব কাটে!

ভোর হতে-না-হতেই রুপাই তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেল। চোখ ভালোমতো মেলতে পারছে না, তবুও ঘুম চোখেই দরজা খোলে দিতে হলো তাকে। অলককে সামনে দেখে বলল, এত সকালে!

অলক কিছু বলল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে একবার দেখে নিল শায়িত স্মৃতিকে। তারপর রুপাইয়ের দিকে সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। রুপাইয়ের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, রাতে নিশ্চিন্তে সে ঘুমিয়ে ছিল। ভরাট মুখ। চোখে ঘুম। সে এখন গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লে আবার গাঢ় ঘুমে ঢলে পড়বে। কিন্তু রাতে তার স্ত্রী কোথায় ছিল, কীভাবে এবং কোথায় কাটিছে, এবং সঙ্গে কে ছিল, তখন যে অনেক কিছু ঘটতে পারত- এসব নিয়ে রুপাইয়ের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র কোনো সংশয়ের চিহ্ন দেখা গেল না। অলকের কেন জানি একটা দীর্ঘশ্বাস বুক বেয়ে উঠে এলো। তার অনেক প্রশ্ন করার ইচ্ছে হয়, কিন্তু করতে পারে না। একটু অভিমান নিয়েই সে তার ঘরে ফিরে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই স্মৃতি স্বগত উচ্চারণ করল, হায়-রে অলক, আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। এখন তোদের সন্তান আসছে, তোরা বিশ্রাম নে। আর ঘরে ফিরে অলক স্বগত উচ্চারণ করল, অদ্ভুত! বৌদি কি করে এতটা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে পারে? গতরাতে সে যখন বাড়িতে ফিরল, তখন তাকে এত বিচলিত হতে আগে কখনো দেখিনি। হয়তো-বা আমাদের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিতায় ছিল। না, সন্তান কামনায় ভারাক্রান্ত মনে হয়েছে তার হৃদয়। তার কষ্টে আমার কণ্ঠরুদ্ধ। স্বর্গের দেবতারা কেন যে ওর প্রতি করুণা করে না? তার শুভকামনা যে করে না তার অন্তর যেন শোকদুঃখে দংশিত হয়।

স্মৃতি এত স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে আছে তা দেখে রুপাইয়ের মনে হলো, স্মৃতি আসলে রক্তমাংসের মানুষ নয়। তার ওপর রুপাইয়ের কেমন যেন একটা সন্দেহ জন্মাল। বলা যেতে পারে স্মৃতির ওপর একধরনের দুঃখবোধে সে পীড়িত হতে লাগল। সে বুঝতে পারছে, স্মৃতির যেন কোথায় একটা তার জন্য ভারি অবহেলার জায়গা সৃষ্টি করে চলেছে; অথবা স্মৃতি হয়তো-বা ভাবছে, “তুমি কতদূর যেতে পার আমি তা জানি বাছা। তোমাকে দিয়ে আমার আর কোনো লাভ নেই।” আসলে স্মৃতির প্রতি সন্দেহ রুপাইকে কিছুটা বিমূঘ করে তুলেছে। সে মনে মনে বলল, সন্তান কামনার জটিল দ্বন্দ্ব থেকে কি স্মৃতি এমন ব্যবহার করছে? রুপাই বিছানার পাশে এসে দেখল, স্মৃতির বুকে হাত, হাঁটুর ওপর সামান্য শাড়ি উঠানো, ওর বুক এখনো যেকোনো সুন্দরী যুবতীর মতো পবিত্র। কিন্তু ঘুমে আচ্ছন্ন। সে জানে, গতরাত স্মৃতি কোথায় গিয়েছিল অণিমার সঙ্গে, আর তাই হয়তো-বা স্মৃতির প্রতি, এই মুহূর্তে, বেশি আকর্ষণ অনুভব করছে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে আবার খাটে এলো, স্মৃতির পাশে। ঘুম থেকে রুপাই যখন উঠল তখন প্রায় সকালবেলাটা শেষ হওয়ার পথে।

স্মৃতি সহজভাবে বলল, কাজে না গেলে হয় না।

রুপাই নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিলো, না যাই। মেলা কাজ।

স্মৃতি মুচকি হাসল। রুপাই খুব লাজুক বালকের মতো ছুটে গেল স্নানের জন্য পুকুরে। শেষ সকালের চায়ের পেয়ালাটা হাতে তুলেও আবার নামিয়ে রেখে ছুটল মাঠের দিকে।

অবশ্য মাঠে গেল না, এসে উপস্থিত হলো সাধুবাবার আশ্রমে।

রুপাই উদ্ধতভাবে বলল, বাড়াবাড়ি করছ তুমি সাধুবাবা, বজ্জাত কোথাকার!

একথা শুনে সাধুবাবার চোখের সামনে যেন একটা আন্ধকারের যবনিকা ঝুলতে থাকে। মানুষের তীব্র অভিযোগ, অনুযোগ, বিরাগ, ভ্রূকুঞ্চন জোর করে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সাধুবাবার। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, প্রভুর আশ্রমে এসে এসব কী কথা!

রুপাইয়ের অসন্তোষ, অসহিষ্ণুতা, তীক্ষ্ণ অভিযোগ ঝড় তুলল, বলল, তোমার কি কোনো লজ্জাশরম নেই। পাগল হয়ে গেলে না কি?

সহিষ্ণুতার যে অসীম সমুদ্রটি আছে সাধুবাবা হয়তো সেই সাগরতীরের বাসিন্দা। তাই শান্ত কণ্ঠে বললেন, আমাকে তোর পাগল মনে হচ্ছে? কেন বল তো? পাগলের কথা ও কাজে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না, আমি তো খাপছাড়া কিছুই করিনি।

করোনি?

না। আমি বাজে কথা বলি না, খাপছাড়া কাজও করি না।

এত অহংকার তোমার! নিজেকে মহাপুরুষ হিসেবে ভাবছ!

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সাধুবাবা বেশ ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ; কিন্তু তার অপছন্দের একটা কাজও করতে সাহস পায় কেউ! ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে তার ভক্তরা। তিনি রীতিমতো রুপাইকে সমীহ করে বললেন, অবিশ্যি না। তবে একটা সত্যকথা বলি তোকে, আমাকে অহংকারী মনে হয় কেন জানিস? তোর সঙ্গে কথা বলার সময় আমি মনে করি, তুই আমার ছেলে; কিন্তু তুই যখন কথা বলছিস, তখন আমাকে পিতার আসনে রাখছিস না। পিতাকে মারার জন্য লাঠি তুলতে চাস। কিন্তু ভুলে চাচ্ছিস, পিতাকে মারলে পুত্রেরই হাত যে খসে যাবে। কুষ্ঠ হবে সেই হাতে।

রুপাইয়ের মুখ থেকে প্রতিবাদ ঝরতে লাগল, আত্মমর্যাদা বলতে দেখছি তোমার কিছুই নেই। সবই ফাঁকা গর্ব! গোঁয়ার তুমি! মানুষের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা ছাড়া বুঝি তোমার আত্মমর্যাদা টেকে না? এজন্যই তোমার সঙ্গে আমার ঠেক্কা লেগেছে। দরকার হলে প্রকাশ্যে হাতাহাতিও হতে পারে।

রুপাইয়ের মুখে হাতাহাতি শব্দটি শুনে সাধুবাবার মুখটা কাঠ হয়ে উঠল। অপমান হচ্ছে। বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে। চোখদুটি শিথিল হয়ে যায়। তারপরও এক রকমের অদ্ভুত ভাষায় বললেন, তুই কেন আমার প্রতি এত খেপে আছিস, তা বুঝিয়ে বলি তোকে।

রুপাই স্থির গলায় বলল, আমার না বুঝলেও চলবে।

তা চলবে না। কথাটা তোকে না বুঝিয়ে দিলে হবে না।

বুঝেও যদি না বুঝি?

বুঝবে বই কি, বোঝালেই বুঝবি। আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্যে হলেও তোকে বলতেই হয়।

তোমার আবার আত্মমর্যাদা!

সংকল্পে দৃঢ় সাধুবাবা বললেন, অবিশ্যি আছে, তাই বলছি, তুই ভেবেছিস তোর বউয়ের মনোবাসনা পুরণের জন্য মন্ত্রোচ্চারণ করে সন্তান এনে দিলে লোকের কাছে তোর অপমান হবে। নিজের কাছে ভীরু-অপদার্থ বলে মনে হবে। ব্যাপারটা কী বিশ্রী, তুই উলটেপালটে সেই কথাই ভাবছিস। তাই তোর মনে শান্তি নেই। তুই আমাকে ভক্তি করিস বা না-করিস সেকথা ভিন্ন। তবে তুই যদি তোর বউয়ের সঙ্গে দুটি মিষ্টিকথা বলতি তাহলে একমুহূর্তে সব রাগ জল হয়ে যেত।

রুপাই যেন বুঝতে চায় না সাধুবাবার ¯^রটা। ভাবশূণ্য ধাতব কণ্ঠ¯^রে বলল, বউয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালোই আছে। তোমার স্পর্ধা কম না হলেও বুদ্ধি কিন্তু নেই। বুদ্ধি থাকলে আমার বউকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে না। আর যদি কখনো এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তোমাকে রক্ষা করার কেউ পাবে না।

সাধুবাবা যেন দূর থেকে দুটি অপরিচিত নরনারীর স্নিগ্ধ একটি দাম্পত্য জীবনের আস্তে আস্তে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসা, তারপর প্রবল ঝড় ওঠা, অতঃপর সেই ঝড়ে জীবন গৃহের চাল উড়ে যাওয়া- দেয়াল ধ্বসে পড়ার প্রতিটি দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। তার মুখে অমোঘ বাণীটি উচ্চারিত হলো, বললেন, আমার মনে বড্ড কষ্ট দিলি। তোর বুদ্ধির কাছে আমার বুদ্ধি! আমি মানুষের মন জয় করে আশ্রম গড়েছি। আর তুই, নিজের বউয়ের মন জয় করে সংসারই গড়তে পারলি না। পুরুষের মধ্যেও যে একটি পিতৃহৃদয় থাকে সেটা তোর মধ্যে নেই। গভীর আপসোস হয় তোর জন্য।

বাঘিনীর মতো শাবক আগলানোর মতো কণ্ঠে রুপাই বলল, আমার জন্য তোমার আপসোস করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি মানুষের কী সর্বনাশ করছ তা আর কেউ না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝতে পারছি। তাই আবারও বলছি, তোমার অপকর্ম বন্ধ না করলে এই আশ্রম থেকে তোমাকে তাড়িয়ে দিতে আমার সময় লাগবে না। স্পষ্ট বলছি, আমার বউয়ের ওপর থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও। অন্যতায়…।

সাধুবাবা জানেন, ভাগ্য চিরদিনই তার প্রতিকূলতা করেছে। তাকে বঞ্চনা করেছে। একটা কাচের টুকরোকে হীরে বলে ভাবিয়েছে। এই অন্ধ মোহেই আজ এখানে, কাল ওখানে আশ্রম গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে সবকিছু ত্যাগ করে একা-একাকী বনোবাসী হতে চান। এই আকাক্সিক্ষত জীবন আহরণ করা যে জ্ঞান থাকা আবশ্যক সেই জ্ঞান কি তার আছে? তিনি অজ্ঞান তো নন, তবুও এই চিন্তাই অবিরাম তার মাথায় ধাক্কা দিয়ে চলেছে, যেমনভাবে আশ্রমের পরদাটিকে বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে। এই পরদার দিকে তাকিয়ে সাধুবাবা বলতে লাগলেন, তুই যা ইচ্ছে করিস! তোর প্রতি আমার একটাই উপদেশ, বউকে সময় দে। আপন করে নে। মা হয়ে পড়লেই তোর বউ রীতিমতো সুখী হয়ে যাবে।

এই কথা কি এমন বিশদভাবে আগে কখনো চিন্তা করেছে রুপাই। কী করে করবে? সময় পেয়েছে কোথায়? মাঠ-ক্ষেত-পরিশ্রম-অর্থ এসব নিয়েই তো ব্যস্ত ছিল সে। সাধুবাবার কথার কোনো প্রতিবাদ না করেই একটা নিঃসীম শূন্যতার মধ্যে যেন রুপাই অদৃশ্য হয়ে গেল।

রুপাই যখন ফিরে এলো তখন সন্ধ্যা প্রায়। হাতমুখ ধুয়ে যখন ঘরে এলো তখন ঘড়ির কাটা সন্ধ্যার শেষ প্রান্তরে এসে পৌঁছেছে। খেতে বসে রুপাই দেখল, সব খাবারই পরিপাটি করে সাজানো। বলল, এত খাওয়া যায়!

স্মৃতি একবার রুপাইয়ের নিশ্চিন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। সে একটু স্বস্তি ফিরে পায়। এবং এবার বোধ হয় সত্যিই একটু হেসে উত্তর দিলো, অন্যদিন তো খাও!

রুপাই সহজ গলায় বলল, রোজই এক পরিমাণ খেতে হবে বলে কোনো কথা আছে?

না, তা তো নেই। কেউ এক পরিমাণ খায় না। কেটে কেটে আর মেপে মেপে কথাগুলো বলে রুপাইয়ের পাশে মাটিতেই বসে পড়ল স্মৃতি। তারপর বলল, যা পার খাও। বাকিটা আমি খেয়ে নেব।

রুপাই ভাত, ডাল আর মাছ ভাজা দিয়ে কিছুটা খেলো। মাছের ঝোল নিয়ে খাবার শেষ করল।

হঠাৎ দরজার কাছ থেকে অণিমার কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো, বড়ো বউমা এদিকে একবার এসো তো।

রুপাই রসিক গলায় বলল, যাও, মাসি এসেছে।

যাচ্ছি, বাবা।

স্মৃতির দিকে এক ব্যাকুল আর অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রুপাই।

অণিমার কাছে আসতেই স্মৃতির মুখের দিকে তিনিও কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। পরমুহূর্তে সচেতন হয়ে বললেন, সন্ধ্যায় গঙ্গাজল খেয়েছিলে! বিষ্ণুর চরণ থেকে উদ্ভূত বলে গঙ্গা গৌরবান্বিতা, তাই এই জল পবিত্র। সাধুবাবার মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল ঠিকমতো খেলে ফল পাবে বিনা কুসুমে।

খেয়েছি।

ফল পাবে শীঘ্রই। এ তো মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোকে আরোহণ করা। সাধুবাবাকে গ্রামের বউঝিরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে। তার কথা মেনে চললে সুফল পাওয়া যায়।

দেখি!

দেখার কিছু নেই। হবেই। তবে বিশ্বাস রাখতে হয়। বিশ্বাসেই স্বর্গ মিলে জানো না সেই কথা!

বিশ্বাস করেছি বলেই তো মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল খেলাম।

ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন।

পদ্মশ্রী দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো। হঠাৎ অণিমার দুই হাত চেপে ধরে বলল, মাসিমা, তোমাকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান।

অণিমা বললেন, কেন?

নির্বোধের মতো মাথা নেড়ে পদ্মশ্রী বলল, না, তেমন কিছু না। সাধুবাবার কাছ থেকে একটু মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল এনে দেওয়ার জন্য তোমাকে খুঁজছি।

অণিমা বললেন, কীসের জন্য মন্ত্র-পড়া গঙ্গাজল তুমি চাও?

আমার পেটের সন্তানের সুস্থ্যতার জন্য মন্ত্র-পড়া গঙ্গজল চাই।

তুমি একবার আমার সঙ্গে আশ্রমে চললে ভালো হয় না! জলও পেলে, সঙ্গে তার আশীর্বাদও।

আশ্রমে যেতে আমি পছন্দ করি না। দেখনি, গতরাতও বৌদির সঙ্গে যাইনি। তুমিই এনে দাও, মাসিমা।

ঠিক আছে এনে দেবো। আর কিছু?

না।

তাহলে এখন যাও। বড় বউমার সঙ্গে আমার কিছু একান্ত আলাপ আছে।

ঠিক আছে, গেলাম।

পদ্মশ্রী চলে যেতেই স্মৃতিকে অণিমা চুপিচুপি- যাতে ঘর থেকে রুপাই শুনতে না পায়- বললেন, আমাদের কথা কি কেউ শুনতে পাচ্ছে?

না, কেউ না।

তোমাকে একটা কথা বলব বলব করেও সারাদিন বলা হয়নি।

অণিমার অচেনা স্বরে স্মৃতি বিদ্যুতের মতো চমকে ওঠে, বলল, কী!

কাতরস্বর ভেসে এলো অণিমার গলা দিয়ে, সাধুবাবা বলেছেন, দোষটা তোমার নয়, রুপাইয়ের। ওর কারণেই তুমি সন্তানহীন। ইচ্ছে করলে ওকে ছেড়ে তুমি চলে যেতে পার।

স্বামীত্যাগ! গৃহত্যাগ! অসম্ভব।

স্মৃতির দৃষ্টিতে এ কী কাঠিন্য! ও কি অন্ধ? ওর চোখদুটি কি পাথরের তৈরি? ও কি সত্য দেখতে পাচ্ছে না? কী বলছে ও? অণিমা হতাশভাবে বললেন, তাহলে যেমন আছ তেমনই থাকো। সন্তান লাভের ইচ্ছে আর করো না।

স্মৃতি স্বচ্ছন্দে অণিমার মুখের ওপর বলে বসল, আমার সংসার- স্বামী, দেবর, ঝা- এসব ফেলে চলে যাব? এমন কথা তুমি স্বপ্নেও আর মুখে এনো না, মাসিমা। এই সংসারের জন্য সন্তানহীন হয়ে যদি আমাকে থাকতে হয় তাও ভালো। তোমার এমন কথা যেন এই প্রথম ও শেষবারের মতো আমাকে শুনতে হয়। এখন তুমি যাও।

অণিমা আর অপেক্ষা করলেন না। নিঃশব্দে চলে গেলেন। তখনই স্মৃতি আশ্চর্য হয়ে দেখল, রুপাই বারান্দায় উপস্থিত। স্মৃতির কণ্ঠ ঝঙ্কৃত হয়ে ওঠে, বোবার মতো এতক্ষণ এখানেই ছিলে তুমি?

হু।

লুকিয়ে লুকিয়ে কথা শোনছিলে বুঝি!

হু।

তুমি তাহলে সবই শুনেছ!

হু। এখন আমার কথা শোনো।

বলো!

একটা অভিযোগ আছে তোমার প্রতি!

স্মৃতি হঠাৎ রুপাইয়ের ভাবপরিবর্তনের কারণ নির্ণয় করতে না পেরে বলল, কীসের?

তিক্ততার।

তিক্ততার! স্মৃতি বিদ্যুতাহতের মতো শিউরে ওঠে। তুমি আমাকে অবাক করলে।

আগ্রহের স্বর ধ্বনিত হয় রুপাইয়ের কণ্ঠে, মনের মধ্যে জমে থাকা সকল তিক্ততার অবসান ঘটুক এই মুহূর্তে। প্রকাশিত হোক উন্মুক্তভাবে নিমজ্জিত সকল তিক্ততার।

একটি অদৃশ্য আকর্ষণে যেন টানতে থাকে স্মৃতিকে রুপাইয়ের দিকে। শুধাল, এখনই?

অন্ধের মতো রুপাই স্মৃতিকে অনুসরণ করে। এক ব্যাকুল আবেগ তার অস্থিতে, মজ্জায়। বলল, যে-খেলায় কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সেই খেলায়ই আমরা মেতে উঠব এখন।

হঠাৎ রুপাই এমন দুঃসাহসী হয়ে উঠল কি করে? ওর দিকে বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্মৃতি ভীষণ স্বরে বলল, দরজা বন্ধ করে দাও।

তোমাকে পরিপূর্ণভাবে চাই।

সংসার আর রমণী- দুটিই!

দুটিই। যে সামান্য উষ্ণতা দিয়ে আজকের দিনটা শুরু হয়েছিল তা এখন পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাব।

কী দেখছ এমন ভাবে?

তোমাকে। জ্যোৎস্নার আলোয় তোমাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। তোমাকেই আমি আজীবন ভালোবেসে যাব।

Share This Article
ড. মুকিদ চৌধুরী একাধারে বিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার। বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর সুদীপ্ত পদচারণা। তিনি বহুমাত্রিক লেখক। সকল রচনাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় পারদর্শিতা অর্জনে লিপ্ত। তিনি একাধারে সৃষ্টিশীল ও মননশীল লেখক। তাঁর সাহিত্য, ভাষা, বিজ্ঞান, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্লেষণ যেমন সুপ্রশংসিত তেমনি কাব্য ও কথাসাহিত্যেও। এই দুটি শাখায় তাঁর শিল্পীসত্তা ও মননশীলসত্তা প্রকট। সাহিত্যজগতের বোদ্ধামহলে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি, সাহিত্য-নাট্য-প্রবন্ধ-গবেষণা-বিজ্ঞানসম্পর্ক রচনার কারণে।