কুপতলা ব্রিজের গেরিলা হাবিব

আশিক মুস্তাফা
আশিক মুস্তাফা 469 Views

একটু পরেই ভোরের আলো ফুটবে। মানুষ ঘুমের দেশে। শুধু ঘুম নেই মুক্তিযোদ্ধাদের। কমান্ডার আমিনুর রহমান তালুকদার পিচ্চি হাবিবকে কাছে ডাকলেন। কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘শোন, আশপাশে তাকাবি না। তবে কান খাড়া রাখবি খরগোশের মতো, যাতে শত্রুর আনাগোনা টের পাস। খুব সাবধানে গিয়ে বারুদের তারে আগুন ধরিয়ে দিয়েই চলে আসবি!’

কমান্ডারের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে কাজটা কষ্টের এবং একই সঙ্গে ভয়েরও। তবে মোটেও ভয় পায় না হাবিব। তার শুধু বুকে নয়; শরীরজুড়েই সাহস! গামছা দিয়ে কোমর বেঁধে ডেম কেয়ার ভাব নিয়ে বারুদের তারে আগুন ধরাতে পথে নামে। পানিতে সাঁতরে আস্তে আস্তে আগাতে থাকে। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে কোমরের গামছায় লুকিয়ে রাখা ম্যাচ বের করে। আগুন ধরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু না; আগুন ধরছে না। বারুদ ও ম্যাচের কাঠি ভিজে জবুথবু হয়ে গেছে। ভড়কে যায় হাবিব। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তার। তবু চেষ্টা করে। না, সেফটি ফিউজ ও বারুদের তারে কোনোভাবেই আগুন ধরানো যাচ্ছে না। চেষ্টা চালিয়ে যায় হাবিব। একই সঙ্গে বুদ্ধিও। মাথা খাটিয়ে হাবিব জামার শুকনো অংশের সঙ্গে বারুদ ঘষতে থাকে। একসময় গরম হয়ে উঠে বারুদ। আর অমনি কাঠি মেরে আগুন ধরিয়ে বারুদের তারে আগুন লাগিয়ে পল্টি খেয়ে পানিতে পড়ে দ্রুত পেছনে চলে আসে। দুই মিনিটের মাথায় কানে আসে বিকট শব্দ। জ্বলে উঠে আগুনের লেলিহান শিখা; ছড়িয়ে পড়ে রেলের স্লিপার, লোহার পাত, পাথরের গুঁড়ি। সফল হয় অপারেশন কুপতলা ব্রিজ। নায়ক হয়ে উঠে পিচ্চি হাবিব। মাত্র পনের বছর বয়সি হাবিব এই অপারেশনের পর দলের সবার আরও প্রিয় হয়ে উঠে।

এর ভেতর হাবিবের ডাক পড়ে টাঙ্গাইল আর জামালপুরে। যেই কাজ করতে বড়রা তেমন সাহস পায় না ছোট্ট হাবিব আগ বাড়িয়ে সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। কুপতলা ব্রিজের পর সে একেএকে টাঙ্গাইল-জামালপুর সড়কের বিভিন্ন ব্রিজ গুঁড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। পাকিস্তানিদের ছিলো রাজ্যের অসস্তি। আর ছোট্ট হাবিবের ছিলো সাহস আর বুদ্ধি। এই সাহস আর বুদ্ধির সঙ্গে কিছুতেই তারা পেরে উঠতো না। বুকভরা সাহস নিয়ে হাবিব কাজে নামে। একএক করে গাইবান্ধা সদরের কুপতলা রেলওয়ে ব্রিজের মতো সব ব্রিজ গুঁড়িয়ে দেয়।

পিচ্চি হাবিবের বাড়ি জামালপুরের রশিদপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে। তখন নয়াপাড়ায় কোন হাইস্কুল ছিলো না। কেউ হাইস্কুল পড়তে চাইলে তাকে যেতে হতো সুদুর মধুপুরের ধনবাড়ীতে। হাবিবও গেল ধানবাড়ী পাইকসা উচ্চবিদ্যালয়ে। ভর্তি হলো সেখানে। তখন তো অতো টাকা পয়সা ছিলো না মানুষের। ছাত্ররা মানুষের বাড়িতে ছেলেপুলে পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে জায়গির থাকতো। এতে নিজের পড়া আর থাকা খাওয়াটাও চলতো। হাবিবও লজিং-এ উঠলো। পড়াশোনা ভালোই চলছে। চলছে মাষ্টারিও। ছোট্টমোট্ট মাষ্টারটাকে গ্রামের মানুষ খুব কদর করতো। দহৃর থেকে সালাম দিয়ে জানতে চাইতো, ‘কেমন আছেন মাষ্টার মশাই?’ লিটল মাষ্টার মাথা এক দিকে হেলিয়ে বলতেন, ‘জ্বি, বেশ ভালো আছি।’

কিন্তু বেশিদিন ভালো থাকতে পারে না হাবিব। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় গোটা দেশ নড়ে উঠে। এর ভেতর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ডাকও তার কানে আসে। তবে নির্দিষ্ট দিনে ডাক শোনেনি হাবিব। একদিন পর মানে ৮ মার্চ হাবিব বেতারে সেই ভাষণ শুনেই নড়েচড়ে বসে। গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়। স্থির হয়ে বসতে পারে না। মন ধরে রাখতে পারে না ঘরে। যুদ্ধের ভাবনায় পড়ে। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করে। দেখলেই রাস্তায় দাঁড়ায়। সালাম দিয়ে খবর জানতে চায়। তার ছাত্রছাত্রীরাও পড়াশোনা করে দেশের জন্য কাজ করতে চায়। কিন্তু এমন হলে কীভাবে সম্ভব? তারা যে বেড়ে উঠতে পারবে না। দেশের জন্য কাজ করতে পারবে না। নিজেদেরও এগিয়ে নিতে পারবে না। তাদের জন্য, দেশের জন্য হাবিবের যে কিছু করতেই হবে! ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্তও নিয়ে নেয় যুদ্ধে নামার। ছোট্টমোট্ট মানুষ; কীভাবে যাবে যুদ্ধে? পথ খুঁজতে থাকে। এর কাছে ওর কাছে যায়। ঘুরতে ঘুরতে নয়াপাড়া হয়ে চলে যায় ভারতের মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জে। নাম লেখায় শরণার্থী শিবিরে। সেখানেই দেখা পায় সময়ের আলোচিত যাত্রাপালার নায়ক অমলেন্দু বিশ্বাস ও নায়িকা জ্যোৎস্না বিশ্বাসের।

মার্চ মাসে তারা যাত্রাপালা নিয়ে নয়াপাড়ায় হাবিবদের গ্রামে গিয়েছিলো। সেখানে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো কিশোর হাবিবের। সেই পরিচয়ের সহৃত্র ধরে জ্যোৎস্না বিশ্বাস ছোট্টমোট্ট হাবিকে দেখেই চিনে ফেললেন। চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘এই তুই হাবিব না? এখানে কখন আসলি, কীভাবে আসলি?’ হাবিব কথা বলে না। তার চোখে মুখে যুদ্ধের আগুন। জ্যোৎস্না বিশ্বাস তার চোখে চোখ রেখেই সব বুঝতে পারেন। এই ছেলেকে দমানো যাবে না। সে যুদ্ধে যাবেই! হাবিব দেশের জন্য লড়বে; এই ভেবে তার বুকটা গর্বে ফুলে উঠে। এরপর তিনি প্রায় খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন হাবিবের। মহেন্দ্রগঞ্জে তিন দফা প্রশিক্ষণ শেষে মেঘালয়ের ভারতীয় সেনাদের তোরা ক্যাম্পে যায়। সেখানে ভারতীয় সেনা সুবেদার মেজর অমর সিং ছিলেন প্রশিক্ষক। আক্রমণ পদ্ধতি, আত্মরক্ষা, রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপ, গ্রেনেড ছোড়াসহ গেরিলা যুদ্ধের সব ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় হাবিবকে। ছোট্ট হাবিব এসবের পাশাপাশি রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি চালানোর প্রশিক্ষণও নেয়। টানা দুই মাস উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে হাবিব দেশে ফিরে আসে। ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। মুখোমুখি যুদ্ধেও ভয় পায় না সে। কখনও পিছু হটে না। তার সাহস দেখে বড়রা নতুন করে সাহস খুঁজে পায়।

এর ভেতর একদিন বড়সড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয় হাবিবদের বাহিনী। মধ্যে কামালপুরের যুদ্ধ। জায়গাটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বিপরীতে জামালপুর জেলার পাহাড় ঘেরা বকশীগঞ্জ উপজেলায়। এটি হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি। কেউ দিনের বেলায়ও অই পথ মাড়াতো না। সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনায় ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা এই ঘাঁটি অবরোধ করে। শুরু হয় মুখোমুখি যুদ্ধ। যুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের একটি পা উড়ে যায়। দশ দিন ভয়াবহ যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে হাবিবদের কাছে। মুক্ত হয় কামালপুর। ১০ ডিসেম্বর মুক্তিসেনারা হানাদার বাহিনীর হেডকোয়ার্টার পুরনো ওয়াপদা ভবন দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলার বিজয় পতাকা উড়িয়ে দেয়। মুক্ত হয় জামালপুর। এই বিজয়ের নায়ক ছোট্টমোট্ট হাবিব। জয়ের পর বড় মুক্তিযোদ্ধারা হাবিবকে কোলে তুলে জয় বাংলা শেম্লাগান দেয়। রাস্তার পাশে বৌ-ঝিরা দাঁড়িয়ে হাবিকে দেখে। সবার চোখে বিজয়ের হাসি। স্বাধীন দেশে স্বাধীন মানুষের আনন্দ দেখে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে হাবিবের।

Share This Article
আশিক মুস্তাফা পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি সম্পাদনা করছেন দৈনিক সমকাল পত্রিকার ছোটদের পাতা 'ঘাসফড়িং'। যুক্ত আছেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমী থেকে প্রকাশিত শিশু বিশ্বকোষের সঙ্গেও। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব চিলড্রেনস কনটেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৫ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুসাহিত্যের উপর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমী শিশুসাহিত্য পুরস্কার। ইউনিসেফ প্রদত্ত মিনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড এবং কবি হাবীবুর রহমান সাহিত্য পুরস্কার। প্রথম অনুবাদ বইয়ের জন্য পেয়েছিলেন ছোটদের মেলা সেরা বই পুরস্কার।