দেহের খুঁড়লে বিষকাটালি ঝোঁপ

মিহির হারুন
মিহির হারুন 242 Views

চোর পুলিশ খেলতেই কছি’র দিন কেটে যায়। পকেট হাতড়ে দেখে মাত্র পঁচিশ টাকা, মোটা এক কেজি চাল পয়তাল্লিশ টাকা। সেও কিনতে পারলে না হয় শুকনা মরিচ ডলেই খাওয়া যেতো ;
দোকানেও বাকি পরে আছে।
মিষ্টি আলু খেতে নিজেরও আর ভালো লাগে না। রোজ রোজ কি আলু খাওয়া যায়? তারপরও আজ আলু কেনা ছাড়া কছি’র আর কোন রাস্তা নেই। বিশ টাকায় এক কেজি আলু, পাঁচ টাকার নবাব বিড়ি নিয়ে আজও সে বাড়ি ফিরে।

কছির বউয়ের মুখ যেন ভাতের ফেনা উৎলানো হাঁড়ির মতো গদগদ করছে, স্বামীকে দেখে উত্তাপ আরও বেড়ে যায়। পরিবেশ বেতালা দেখে সে মাটির বারান্দায় চুপ করে বসে থাকে। বউ এসে দেখে গামছায় বাঁধা আলু চাল না, দেখেই বাম পা দিয়ে ছুঁড়ে দেয় ওঠানে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে ঘরের দরজা লাগিয়ে কাঁদতে থাকে।

মুহুর্ত পড়েই তাদের দশ বছরের ছেলে রুক্কু খেলা শেষে বাড়ি ফিরে দেখে ওঠানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সব মিষ্টি আলু।
রুক্কু দৌড়ে বাবার কাছে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করে,

: বাজান, আইজকাও হেই আলু আনছো?

রুক্কু আর কোন প্রশ্ন না করে ঘরে যেতে দেখে দরজা বন্ধ ভেতরে মা কান্না করছে। রুক্কু সবই বুঝতে পারলো।
বাবাকে সে খুবই ভালবাসে। মা-বাবার ঝগড়ায় সে বাবার পক্ষেই থাকে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে দু’জন মিলে ওঠানে ছড়ানো মিষ্টি আলু তুলে নিয়ে, ধুয়ে পাতিলে সেদ্ধ করতে দেয়। ফাঁকে ফাঁকে বাপেপুয়ে ফুসফাস আলাপও চলে। রুক্কু বলে,
: বাজান, মায়ের এতো রাগ কেন্?
: তোর মায় তুলারাশি, তুলারাশি মানুষের
.. রাগ বেশী।
: তাইলে তুমি কি রাশি?
: আমারতো জন্মকুষ্ঠী নাই কেমনে জানুম?

আলু সেদ্ধ হয়ে গেছে, দু’জনে গরম আলু খোশা সিলিয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে খেতে থাকে। কছি আদর করে বারবার রুক্কুর মুখে তুলে দিচ্ছে আলু।
রুক্কু বলে,
: বাজান আলুর আর মিডা নাগে না, কেমুন যেন মাডি মাডি নাগে।
: মিডাইতো নাগেই, এই যে আমার নাগতাছে, আলু খাওন বালা, মেলা ভাইটামিনও আছে।
: চাইল আনো না কেন্ বাজান?
: আনমু, নকডাউন ওঠলেই ভারা অইবো, তহন চাইল আনমু ফারামের কুরাইক আনমু, তুমি খাবা।

বলে ছেলের মাথায় কম্পিন ভারি একটা হাত বার বার বুলিয়ে বাবার অপরাধ কিছুটা ঢাকতে চায়।
রুক্কু খুব মন খারাপ করে বলে,
: গুস্তের ছালুন কতদিন খাই না।

ছেলের এই ছোট্ট কথাটি কছির বুকে আচমকা একটা তীক্ষ্ণ ফলা এসে বুকে বিধলো, মুখের একটুকরো আলু যেন ফুলে-ফেঁপে মুখ ভরে যাচ্ছে শুধু চিবিয়ে যাচ্ছে কিন্তু গলা দিয়ে নামছে না। মুখ আর বুকের ব্যাথা দু-চোখ ছেপে কান্না নামলো, গলা শুকিয়ে হেস্কি ওঠে এলো, রুক্কু বাবাকে মাথায় টুকা দিতে লাগলো, আর পানির গ্লাস এনে সামনে দিয়ে বললো,
: বাজান, পানি খাও,তুমি ঠেক্কা পরছো।

পানি খেয়ে, বাইরে এসে দাঁড়ায়, দেখে আকাশে তারাগুলো অন্ধকার খাঁচায় কি যন্ত্রণায় ছটফটাচ্ছে, যেমনটি তার নিজের বুকেও হচ্ছে।

ভেনের পাটাতনে বসে একটা বিড়ি ধরায় কছি, ভাবে এই লকডাউনে কি করে বাঁচবে তারা? ছেলেটা দিনদিন শুকিয়ে খড়ি হয়ে যাচ্ছে, বউ তার সাথে আর ভালো ব্যবহার করছে না,কথায় কথায় মরে যাবে বলে ভয় দেখায়। কি করবে সে? আর কি করারই বা সাধ্য তার?

বিড়িটা পুড়ে এসে হাতে লাগে, বউয়ের বিলাপের সুর রাতচোরা পাখি ঠোঁটে নিয়ে দূরে উড়ে গেলে কছি ভ্যানে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।


পরদিন আবারও যাত্রীর আশায় ভ্যান নিয়ে বসে থাকে কছি। বাজার ভর্তি মানুষের আনাগোনা, চা আড্ডা কিন্তু ভ্যান রিক্সার পেসেঞ্জার খুবই কম।
চায়ের দোকানের টিভিতে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে খবরগুলো কছি’র কাছে বেসামাল লাগে, করোনা বুঝে না সে, পরিশ্রম করে সে বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায় পরিবার।

হঠাৎ সাইরেনের আওয়াজ!

মানুষের ছুটাছুটি, দোকানের শাটার বন্ধের ধুম। বাইরে পেলেই জরিমানা, কান ধরে ওঠবোস, আর লাঠি পেটার ভয়ে মানুষের এ হুড়োহুড়ি।
আজ সত্যি সত্যি পুলিশের গাড়ী।
বাজারে গাড়ি থামিয়েই বাঁশি হুইসেল দিচ্ছে, আর মানুষ দৌড়৷

মনে হয় মেলিটারি শাসন।

কছি ভ্যান নিয়ে দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে হাঁপায়।
পুলিশী টহল শেষে, আবারও সব স্বাভাবিক হয়ে গেলে কছি ভ্যান রেখে একটা আধখোলা চায়ের দোকানে এসে বসে। গনগনে আগুন চুলায়, ভেতরের তাপে ক্যাটলির ঢাকনা মাঝেমাঝেই খুলে যাচ্ছে। তার পাশেই বড় মগে দুধে মোটা শর পড়ে আছে,কড়া মিষ্টি মিষ্টি সুগন্ধ কছি’র নাকে যেন বেহেস্তের দুধ নহরের সুগন্ধে ধাক্কা দিচ্ছে।আর কপালের ওপর তুলতুলে নরম সাদা পাউরুটি গুলো হুরের মতো বাতাসে নৃত্য করছে। ক্ষুধার ইঁদুরগুলো পেটের ভেতর কুটকুট করে নাড়িভুড়ি কাটছে। বারবার লুঙ্গির কোঁচ খুলে তিনটে পাঁচ টাকার কয়েন দেখে আবার কি ভেবে কোঁচে ভরে রাখছে। এদিকওদিক তাকায় কছি,
মনে হচ্ছে কেও তাকে নজরে রেখেছে কিন্তু কই, সবাইতো আপন কাজে ব্যস্ত।


দোকানে একটু ভিড় পরতেই কছি একটা পাউরুটি ছিঁড়ে লুঙ্গির আড়াল করে মুহুর্তে সড়ে পরে। দোকান থেকে হাত দশেক আগ বাড়তেই কে একজন তার হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে।
কছি’র সারা শরীর যেন বিদ্যুৎস্পিষ্ট হয়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খায়।
লোকটির মুখে তাকিয়ে ঝাপসা দেখে সে,
কছিকে টেনে নিয়ে একটু আড়ালে দাঁড়ায়। কছি’র চোখ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে এলে লোকটির মুখ সে দেখতে পায়।

এ মুখ সে কোন দি দেখেনি!

এটাই কি তবে মানুষের মুখ?
নাকি তার দয়ালের মুখ?
যে মুখ সে ঘোরের মধ্যে দেখে?
নিজের বাবাকেও দেখেনি কছি, কি করে বুঝবে তার বাবার মুখটাও এমন ছিলো কিনা?

লোকটি কছি’র হাতে তিনশ টাকা গুঁজে দেয়, চাল ডাল নুন কিনতে বলে। খুচরো আরও বিশ টাকা দেয়ে রুটির দাম দিতে।
চুরি করা পাপ ; মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে হেসে বলে। কছি ডুকরে কেঁদে ওঠতে চায়, ভালো ব্যবহার কছি সহ্য করতে পারে না, আপ্লূত হয়ে যায়, বুক ফেঁটে কান্না আসে তার।
সহসা লোকটি কছিকে বুকে টেনে নেয়।
কছি’র সারা দেহ শীতল হয়ে যায় এমন সুখময় অনুভুতি সে জীবনেও উপলব্ধি করে নি, তাই সে লোকটির পরিচয় জানতেও ভুলে যায়। যখন মনে পড়লো,তখন লোকটিকে আর বাজারে কোথাও খুঁজে পায়নি। তার কেবলই মনে হয় সে তার দয়ালের দর্শন পেয়েছিলো, প্রায়শই আঁধারের ঘোরে “দেখা দেও দেখা দেও দয়াল” বলে চিৎকার করে কছি আকাশের দিকে মুখ তুলে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাতো। সে আজ তাকে দেখা দিয়েছিলো কিন্তু তার পোড়া কপাল তাকে চিনতে পারে নি।
দুঃখে তার মুখ ভার হয়ে যায়।


তিনশ টাকা নিয়ে সে মুতালুর দোকানে আসে,
: মুতালু , দুই কেজি চাইল, এক কেজি হলেন আলু আর আরাই’শ মুসুরি ডাইল দেও ভাই।
: পহড টেহা আছে?
রুক্ষ মেজাজে মুতালু জিজ্ঞেস করে।
: এই নেও টেহা। এক পেক বিড়ি আর একটা গুলের কোটটা দিও।
বলে কছি তিন’শ টাকা মুতালুর হাতে দেয়। মুতালু টাকা নিয়ে ক্যাশ বাক্সে রেখে একটা খাতায় কি যেন লিখে রেখে বেশ কয়েক জন ক্রেতাকে বিদেয় করলো। কছি পাশে দাঁড়িয়েই আছে,
: মুতালু, আমারে সদায় দেওনা কে?
: কিয়ের সদায়?
: সদাইয়ের আগে টেহা দিলাম,,,
: দেখলা না বাহি খাতাত তিন’শ জমা করলাম?
পরায় বছর হয় চাইর’শ তেতাল্লিশ টেহার সদাই নিয়া খাইছো, বাতাস যায় না মিয়া? অহনও রইল একশ তেতাল্লিশ, এডি কবে দিবা হেইডা কও?

মুতালুর কথায় কছি তাজ্জব হয়ে যায়, বিনা কারণে এক টুকরো আকাশ খসে যেন কছি’র মাথায় পরে। সে চিল্লাতে থাকে মুহূর্তেই দোকানের সামনে মহা হুলুস্থুল বাধে ।
মুতালু খুবই বদ লোক, তাই প্রতিনিয়ত ওর সাথে ক্রেতাদের সাথে ঝগড়াঝাটি লাগেই। এক পর্যায়ে মুতালু দোকান থেকে নেমে এসে কছি’র ঘাড় ধরে কয়ে ঝাঁকুনি দিতেই দুর্বল শরীর নিয়ে কছি মাটিতে পড়ে যায়। অনেক লোক জড়ো হলো, বাজার কমিটির সভাপতি এসে মোটা দরাজ গলায় বললো,
: কি অইসে রে মুতালু? কছিরে মারস কে?

কছি এবং মুতালু দু’জনেই দুজনকে অভিযুক্ত করে বয়ান পেশ করলে সভাপতি মুতালুর পক্ষেই রায় প্রদান করলো কারণ মুতালু যতই অপরাধ করুক সে বাজার কমিটির একজন সেক্রেটারি তাকেতো অসম্মান করা যায় না।
এ যেন রাষ্ট্র সমাজের মুখস্থ এক রীতি। মহাবলী’র চিরন্তন এক পূজার্চনা।

কছি গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে কেন যে একবার আকাশের দিকে তাকালো, হয়তো কেও দেখলো না।


কছি আজ বাড়ি যাবে না।
কেন যাবে?
কি নিয়ে যাবে?
কোন মুখে যাবে?

আব্বাস ফকিরের বাড়ি আজ মাহফিল।

প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে ভক্তগণ আসে। দূর দূরান্তের গাঁও থেকে আসে ফকিরগণ, গান,জিকির আর দয়ালের বিলাপে মশগুল হয়ে থাকে সবাই।
এখানে কছি নিয়মিত আসে, দয়ালের জিকিরে মগ্ন হয়ে সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়। বিলাপের ঘোরে তার দয়াল সামনে হাজির-নাজির হন, তাঁর রাঙা পা’দুটি ধরে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে কতো দিন যে কছি মাটিতে পরে ঘুমিয়ে গেছে তার হিসেব নেই।

ফকির বাড়ির রাস্তায় কছি পা বাড়ায়।

খিদের বিষ পেট বেয়ে ক্রমশ পা দুটো কাল করে নেয়, হাঁটতে পারে না সে। একটা গাছের নীচে এসে বসে । খিদে নিবারণ করতে কছি নিজেই এক কৌশল আবিষ্কার করে। এই কৌশল সে তার ছেলেকেও শিখিয়ে দিয়েছিলো একদিন।

এইতো কিছুদিন আগে, বেণীপুর গ্রামে ওহেদ কাজীর কুলখানি ছিলো। বাপ-বেটা মিলে টুপি পাঞ্জাবি পরে দাওয়াতে যাচ্ছে, পথে বাপ-বেটার কত আলাপ বহুদিন পরে তারা গুস্তভাত খাবে। রুক্কু পকেটে পলিথিন নিয়েছে খাবারের শুরুতেই কিছু ভাত তরকারি পলিথিনে ভরে সরিয়ে রাখবে তার মার জন্য। আর যখন গোসতের তরকারি দিতে আসবে বাবা যেন শাখিদারকে বলেন, “ভাইগো, পুলাপান মানুষতো দুই-চার টুকরা বাড়াইয়া দেন, দোয়া করবো, ছুডু মাইনশ্যের দোয়া আল্লাহ কবুল করে।”

কিছু লোক এই পথে ফিরে আসছে তাদের সাথে মুস্তু আর ছবরও আছে। ছবর কছি কে বলে
: ভাইয়ো, হুদাহুদি আর যাইয়ো না, পুলিশে জেফত ভাইঙ্গা দিছে। ওগো জরিবানাও ধরছে।
নগডাউনে নাকি জেফত নাই।

বলতে বলতে ওরা চলে যায়।
কছি আর রুক্কু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।
আরও একদল লোক ফিরে আসে, ওরাও বলে গেলো, “যাইয়া লাভ নাই, জেফত বন্ধ।”

উল্টো রাস্তা ধরে একটা গাছতলায় এসে চুপচাপ দু’জন বসে থাকে অনেকক্ষণ।
নিরবতা ভেঙে কছি জিগায়, “বাজান বেশী খিদা নাগছে?” রুক্কু মাথা ঝু্কিয়ে হ্যাঁ বুঝায়।
কছি একটু হাসি টেনে নিয়ে বলে,
: আহো, আইজ তোমারে একটা ফাইন টেরনিং শিখামু। খিদা থাকবো না।
এই বলে দু’জনে মাটিতে আসন করে বসে, কছি বলে,
: পীড সোজা কইরা বহ, অহন চোখ মুঞ্জ। মুনের চোখ খুলো, চেষ্টা করো, খুলছো? দেহ সামনে সাদা সাদা ভাতের টিবি, পিত্তলের ডেগ ভরা গোস্তের সালুন! দেহা যায়?
অহন সামনে দেহ ভাতের থালি, দুধ সাদা একখান মানুষ তোমার সামনে মুচকি মুচকি হাসে। ভাতের থালিতে ওরুম ভইরা গোস্তের সালুন দিলো, অহন মাহাও, দেরি কইরো না, ভালা কইরা মাহাও।
আহ কি গেরান সালুনের!
অহন খাও, নলা মুহে দেও খাও বাজান খাও, খাইতে থাহো আরও আরও খাও।
অহন পানি খাও, দুই খান ঢেকুর তুলো। কও শুক্কুর আলহামদুলিল্লাহ। মুখটা গামছা দিয়া মুছো।
অহন আস্তে আস্তে চোখ দুইডা খুলো।
কি , খিদা আছে?

রুক্কু সত্যি অবাক হয়ে যায়!
তার পেটে এখন কোন ক্ষুধাই অনুভব হচ্ছে না। রুক্কু বলে,
: বাজান, এইডাতো মস্ত একখান যাদু!

সেদিন রুক্কুকে এই কৌশলটি শিখিয়ে ছিলো।
আজ এই পদ্ধতিতেই কছি বসে খিদেটা নিয়ন্ত্রণ করে নেয়।


মাহফিল শুরু হয় নবীজির প্রতি দরুদ পাঠের পর শুরু হয় ফকিরী গান এবং ভাব সংগীত।
গান কছিকে ক্ষুধাহীন এক আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যায়,পাঁজরের উল্টো দিক থেকে দু’টো সাদা ধবধবে পাখা গজায় যেখানে নীল পাথর ঝলকাচ্ছে। পাখা দু’টিতে হালকা ঝাপটা দিতেই কছি মহাশূন্যে উড়তে থাকে যেখানে সে দেখে অগণিত তারা শিশির বিন্দুর মতো শরীরে জড়িয়ে থাকে, সবুজ উদ্যান, অসম্ভব সুন্দরী মেয়েরা ফুল ছিটিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে।

হঠাৎ গান থেমে যায়।

চোখ খুলেই দেখে তার সামনে মাটির বাটিতে গরম খিচুড়ি, কছি খিচুড়িতে হাত দিতে গিয়ে আবার সড়িয়ে নেয়। প্রসন্ন মুখে বাটি হাতে কছি অন্ধকার ঠেলে বাড়ির পথে রওনা দেয়। কিছু পথ যেতেই তার তলপেটে প্রচণ্ড চাপ হয়, প্রস্রাব সাড়তে হাতের বাটি রেখে অদূরেই বসে পড়ে। প্রস্রাব শেষে পিছন ফিরতেই তার গা শিউরে ওঠে।
কিশোর বয়সী রোগা একটি কুকুর দু’পায় বাটি আঁকড়ে ধরে খিচুড়ি খাচ্ছে। কুকুরটি মাহফিল থেকেই তার পিছু নিয়েছিলো টের পায়নি সে।
কছি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ক্রোধে পায়ের সেন্ডেল হাতে নেয়, কিন্তু কুকুরটা নির্ভয়ে বাটির সামনে বসে থাকে। কছি’র চোখ পড়ে কুকুরটির চোখে, তার হাতের সেন্ডেল পড়ে যায়। কছি ভালো করে তাকিয়ে দেখে কুকুরটা নেই, বাটির সামনে অভিমান করে বসে আছে তার ছেলে রুক্কু। কছির বুক ফেঁটে কান্না আসে,সে বলতে থাকে
ঃ বাজান, আমার রুক্কু! খাও খাও বাজান। এই যে কান ধইরা কইতাছি, আর মিডা আলু আনমু না। খাও বাজান, খাও।

খিচুড়ি খাওয়া শেষ হলে কুকুরটা কছি’র হাসিমাখা মুখখানি দেখে দেখে আঁধারে মিশে যায়।

শূন্য হাতে কছি বাড়ির পথ ধরে হেঁটে চলে।
বাড়ির কাছে আসতেই একটা কান্নার সুর তার দিকে এগিয়ে এলো, বাড়িতে ঢুকে দেখে তার ছেলে বারান্দায় বসে কাঁদছে। কছি জিগায়,
ঃ কি অইসে বাজান, খিদা নাগছে?
ঃ না, মা নাই; কোন খানেই পাই নাই।
ঃ কি কস? আশেপাশে বাড়িত দেকছর?
ঃ সব দেখছি।
বাবাকে জড়িয়ে রুক্কু কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পাটশুলার আটিতে আগুন জ্বালিয়ে কছি বেড়িয়ে পরে, প্রথমে সে গাছের ডাল গুলি ভালো করে দেখে, যদি ফাঁস দেয়।কারণ প্রায়ই সে ফাঁসি দিয়ে মরবে এমনটাই বলতো, কিন্তু না কোথাও রুক্কুর মাকে খুঁজে পেল না।

একটু পরেই পাশের বাড়ির জলিল কছি’র মতই ভ্যান চালক সে এসে সব বিবরণ দেয়, বাজারে শুনে এলো রুক্কুর মা শামসু ভাঙ্গারীর সাথে ভেগে গেছে। কিছুদিন ধরেই তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। বেশ কয়েক জনেই দেখেছে ভ্যানে চড়ে তারা দুজন মধুপুরের রাস্তা ধরে চলে গেছে।

কথাটি শুনে কছি’র দৃষ্টি উঠানে স্থির হয়ে পড়ে রইল, যেখানে একমুঠো শুলার আগুন তখনও পুড়ে নিঃশেষ হয়নি।

Share This Article
মিহির হারুন একজন নাট্যব্যাক্তিত্ব, একাধারে তিনি শিক্ষক, লেখক, মঞ্চাভিনেতা, এবং একজন বাচিক শিল্পী। পাশাপাশি তিনি “বিনোদবাড়ি আইডিয়াল কলেজ” এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের বই মেলায় “মেঘের বাড়ি” নামক একক অভিনয় ও কিশোর নাটকের দুটি বই প্রকাশিত হয়। তার প্রতিষ্ঠীত “শিশু থিয়েটার” এর মাধ্যমে শিশু কিশোরদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রতিভা বিকাশে তিনি নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।