মুক্তিযুদ্ধে পরাশক্তির ভূমিকা

অনুসর্গ - Anusargo.com
অনুসর্গ - Anusargo.com 189 Views

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙ্গালি তার দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র অর্জন করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেকলে ২০০ বছর বন্দী থাকার পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বাঙ্গালির জন্য মুক্তির বার্তা নিয়ে আসতে পারেনি। প্রায় দুই যুগ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনে নিষ্পেষিত হওয়ার পর যখন বাঙ্গালির দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন এ ভূখণ্ডের মানুষ তাদের নেতার আহ্বানে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যে বাংলাদেশের মানচিত্র রচনা করেছিলেন তা পূর্ণতা পায় ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে। এই বিজয় সহজ ছিল না, ৩০ লাখ নিরস্ত্র মানুষের রক্তের সমুদ্র ও ২ লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এসেছে এই মুক্তি।

পাকিস্তান বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে প্রায় ১ কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করায় ভারতকে এই সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়। শরণার্থীদের সহায়তা প্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে ভারত। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিকসহ প্রায় সব ধরণের সহযোগিতা করে ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ২২ নভেম্বর ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করলে ভারত সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ৩ নভেম্বর ভারতে পাকিস্তান বিমান হামলা চালালে ভারতও পাল্টা আক্রমণ চালায়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর যৌথকমান্ডের কাছেই ৯৩ হাজার পাকিস্তানি আত্মসমর্পণ করে।

বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সোভিয়েত রাশিয়া-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল সেসময়। বাংলাদেশকে সরাসরি সমর্থন করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সোভিয়েত রাশিয়া। আর পাকিস্তানকে সরাসরি সমর্থন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ৫ সদস্য বিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের অন্য দুই সদস্য যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বাংলাদেশের প্রতি সহমর্মিতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করে তারা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

পরাশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াঃ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে স্নায়ুযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত রাশিয়া। ১৯৬০ সালের দিকে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সীমিতকরণকে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে ধরে পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করে সোভিয়েত রাশিয়া। একই সময়ে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ক্রমবর্ধমান চীনা আদর্শিক, সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের প্রধান মিত্র ছিল রাশিয়া। আর পাকিস্তানের প্রধান মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। আর এই কারণে শক্তিশালী সোভিয়েত রাশিয়ার সম্পুর্ণ সমর্থন পায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী। ১৯৭১ সালের আগস্টে সোভিয়েত-ভারত মৈত্রী চুক্তি সাক্ষরিত হয় যাতে বলা হয় চীন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাত হলে সোভিয়েত রাশিয়া ভারতের সহয়তায় শক্তি নিয়োজিত করবে। ডিসেম্বরে যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত তখন যুক্তরাষ্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তুললে সোভিয়েত রাশিয়া ভেটো দিয়ে সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। নিক্সন প্রশাসন টাস্কফোর্স ৭৪ গঠন করে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও পারমাণবিক অস্ত্রনিক্ষেপে সক্ষম ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ প্রেরণ করে। জবাবে ৬ ও ১৩ ডিসেম্বর ভ্লাদিভস্তক নৌঘাটি থেকে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর নৌবহর টাস্কফোর্স ৭৪কে অনুসরণ করতে পাঠায় রাশিয়ান নেভি। ভারতীয় মহাসাগরে ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত টার্স্কফোর্স ৭৪কে অনুসরণ করে সেই রাশিয়ান নৌবহর। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত রাশিয়া।

পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঃ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটা বেশ জটিল এবং নেতিবাচক ছিল। তবে মার্কিন জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে বাঙালির মুক্তি আন্দোলন। ভূরাজনৈতিক জটিলতার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ২৫ মার্চের কালোরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে সেটাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে বøাড ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং পাকিস্তান সরকারের প্রতি সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানালেও তাতে কান দেয়নি নিক্সন প্রশাসন। স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার, তিনি পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখেন। জুলাইয়ে পাকিস্তানের সহায়তায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে গোপনে চীন সফর করেন কিসিঞ্জার। আগস্টে রুশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি সাক্ষরের পরে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ প্রদান করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানকে গোপনে পূর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের আহŸান জানায়। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের ৩ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পাকিস্তানের সামরিক সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। শেষ পর্যায়ে যখন ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান তখন সংকটের জন্য ভারতকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের মাধ্যমে ভারতের সামরিক আগ্রাসন থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য অস্ত্রবিরতির আলোচনা শুরু করে। শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইউএসএস এন্টারপ্রাইজসহ আটটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পাঠায়। রাশিয়াও পাল্টা শক্তি প্রদর্শন করে। ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

পরাশক্তি চীনঃ

পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল চীন। তবে বেশ সতর্কতার সঙ্গে চীন এই সংকটকে পর্যবেক্ষণ করেছে। পাকিস্তানে ভারতের আক্রমণের কথা অনুমান করেই নিক্সন প্রশাসন ভারতে আক্রমণ করতে উৎসাহিত করলেও চীন জাতিসংঘের মাধ্যমে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়েই বেশি আগ্রহী ছিল। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ভারতকে পেয়েছিল চীন যার ফলে সহজেই ভারত পরাভূত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে চীন আক্রমণকে সম্ভাবনা ধরে ভারত-চীন সীমান্তে ৮টি মাউন্টেন ডিভিশন মোতায়েন করেছিল ভারত।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতে আক্রমণের পরে চীন জাতিসংঘে সরাসরি বাঙালি বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধের জন্য চীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ী করে। যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা এবং পাকবাহিনীর বর্বরতার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে ৫ ও ৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘে দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে যা চীন ভেটো দিয়ে বাতিল করে দেয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলে চীন এক বিবৃতিতে ‘তথাকথিত’ বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের তীব্র সমালোচনা করে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও বাংলাদেশের প্রতি চীনা বৈরিতা অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘের সদস্য হতে বাংলাদেশ আবেদন করলে সেটা বাতিল হয়ে যায় চীনের ভেটো দেওয়ার ফলে। ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর ১৫ দিন পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় চীন।

পরাশক্তি যুক্তরাজ্যঃ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি কোনো ভূমিকা পালন না করলেও বেশ গুরুত্বপুর্ণ অবদান রয়েছে এই ভূ খণ্ডের সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক যুক্তরাজ্যের। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পরেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সেই বিষয়ে আলোচনা হয়। ২৯ মার্চ হাউস অব কমন্স সভায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ-বিষয়ক সচিব স্যার অ্যালেস ডগলাস হিউম পূর্ব বাংলায় বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোয় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানকে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানান। অনেক ব্রিটিশ এমপি ভারতে শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার শরণার্থী শিবির গুলোতে প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড সহায়তা প্রদান করে। আরো প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড প্রদান করা হয় যুদ্ধরত পূর্ব বাংলার সহায়তায়।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের প্রচার মাধ্যম বিশেষ করে বিবিসি এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকা বাঙালিদের ওপর পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতন, প্রতিরোধ বাঙালির সংগ্রাম, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের করুণ অবস্থা, পাকবাহিনীর গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ব জনতাকে জাগ্রত করে তোলে। লন্ডন ছিল বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারের প্রাণকেন্দ্র। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের পাঠানো বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে যান। হিথ্রো বিমানবন্দরে হাজারো বাঙালি তাকে সংবর্ধনা দেয়। ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য।

Share This Article