বীরত্বে গাঁথা বীরশ্রেষ্�

শরীফ খান
শরীফ খান 523 Views

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের অসামান্য অবদানের কথা বাংলার মানুষ কখনও ভুলবে না আর তাঁদের এই ঋণ কখনো কোনভাবেই শোধ করবার নয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা রক্ত দিয়ে গেছেন, তাঁদের রক্তের প্রতিকী লাল সবুজ পতাকাকে আমরা স্যালুট করে মূলত তাঁদেরকে সম্মান জানাই প্রিয় মাতৃভূমিকে সম্মান জানাই।

বীরশ্রেষ্ঠ বীরত্বের জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কার। মহান ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপন করেছেন তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বীরত্ব পদকে ভুষিত করেছেন। তন্মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ বীরত্ব পদক হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে ।

আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের তাঁদের সাহসীকতা এবং প্রিয় দেশকে ভালবেসে যেভাবে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে সেইসব বীরত্বে গাঁথা বীরশ্রেষ্ঠদের ইতিহাস জানবো, পড়বো এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে দেবো। যাতে করে নতুন প্রজন্মের প্রতিটি নাগরিক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়। তারাও যেন এই মহান বীরদের মতো দেশের যেকোন দুঃসময়ে দেশকে ভালবেসে আত্মত্যাগী হয়ে নিজ প্রাণ হাসিমুখে উৎসর্গ করতে পারে।

১। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (৭ মার্চ ১৯৪৯ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্�” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাঁদের অন্যতম।

তিনি মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। বরিশালের রহমতগঞ্জ গ্রামে নেয়া বাংলার বীর সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মহানন্দা নদীর কাছে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার সময় শত্রুর বুলেটের আঘাতে শহীদ হন। তাঁর উদ্যোগে মুক্তিবাহিনী ঐ অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। যার ফলাফলস্বরূপ মুক্তিবাহিনী প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে এবং ওই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করে। তাঁর সম্মানে ঢাকা সেনানিবাসের প্রধান ফটকের নাম “শহীদ জাহাঙ্গীর গেট” নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হয়। অসংখ্য স্বাধীনতা প্রেমিক জনগণ, ভক্ত মুক্তিযোদ্ধা, অগণিত মা-বোনের নয়ন জলের আশীর্বাদে সিক্ত করে তাঁকে এখানে সমাহিত করা হয়।

২। বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান

মোহাম্মদ হামিদুর রহমান (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ – ২৮ অক্টোবর ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভ‚ষিত করা হয় তিনি তাদের মধ্যে একজন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে শহীদ হওয়া হামিদুর রহমান সাত জন বীর শ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তি হন সিপাহি হামিদুর রহমান। ২৫ মার্চে চট্টগ্রাম প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর সকালে হামিদুর রহমান ধলই বিওপি-তে পাকিস্থানীদের ঘাটি দখলের যুদ্ধে শত্রুর পাল্টা আক্রমণে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হামিদুর রহমানের মৃতদেহ প্রাথমিকভাবে সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখন্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। ২০০৭ সালের ২৭শে অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে গ্রহণ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

৩। বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল

মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিম হাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাবিবুর রহমান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার ছিলেন। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর উচ্চ বিদ্যালয়ে দু-এক বছর অধ্যয়ন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক “বীরশ্রেষ্ঠ” পদক দেয়া হয় মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজ প্রাঙ্গণের একটি কোণে ভোলা জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল লাইব্রেরি ও জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। এছাড়া মোস্তফা কামালের নামানুসারে গ্রামের নাম মৌটুপীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে কামালনগর।

সেনা সদস্য হবার স্বপ্নে বিভোর মোস্তফা কামাল ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লায় ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধের এক পর্যায়ে ১৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দরুইল গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিহত করতে গিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল শাহাদাৎ বরণ করেন। ব্রাহ্মানবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার দরুইল গ্রামের আপমর জনগণ অতি সম্মান ও আন্তরিকতার সাথে তাকে শাহাদাতের স্থানের পাশেই সমাহিত করেন।

৪। বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন

মোহাম্মদ রুহুল আমিন (১৯৩৫ – ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তাকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব “বীরশ্রেষ্ঠ” প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।

১৯৩৫ সালের জুন মাসে, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার বাঘচাপড়া গ্রামে। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন। পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর গানবোট “পলাশ” এর ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উঁচুতে তিনটি জঙ্গি বিমানকে উড়তে দেখা যায়। বিমানগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলা এসে পড়ে “পদ্মায়” এবং পরবর্তীতে “পলাশে” আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে। গোলার আঘাতে রুহুল আমিনের ডান হাতটি সম্পূর্ণ উড়ে যায়। অবশেষে পলাশের ধ্বংশাবশেষ পিছে ফেলেই আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসা নদীতে। অদম্য সাহসী এ যোদ্ধা একসময় পাড়েও এসে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে রাজাকারের দল অপেক্ষা করছে তার জন্য। রূপসার পাড়েই আহত এই বীর সন্তান কে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তাঁর বিকৃত মৃতদেহ অযত্নে, অবহেলায় বেশকিছুদিন সেখানে পড়ে ছিলো। স্থানীয় জনসাধারণ খুলনা জেলার বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীর পাড়ে তাঁকে দাফন করে এবং সেখান একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

৫। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (২৯ অক্টোবর ১৯৪১ – ২০ আগস্ট ১৯৭১) বাংলাদেশের একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তাকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব “বীরশ্রেষ্ঠ” প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যশোর বিমান ঘাটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ নভেম্বর পুরান ঢাকায় অবস্থিত মোবারক লজ-এ জন্মগ্রহণ করেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ১৯৬৩ সালে করাচির মৌরিপুর এয়ার বেজে জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে পরিবারের চাপে পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে মশরুর বিমানঘাঁটিতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে ২০ আগস্ট করাচি থেকে প্রশিক্ষণ বিমান ছিনতাই করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ছিনতাইকালে পাকিস্তানি শিক্ষার্থী রাশেদ মিনহাজের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে তিনি শহীদ হন। পাকিস্তান সরকার মতিউর রহমানের মৃতদেহ করাচির মাসরুর বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে সমাহিত করে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৪ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫শে জুন ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

৬। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

মুন্সি আব্দুর রউফ (১ মে ১৯৪৩ – ০৮ এপ্রিল ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম বীরত্ব, চরম সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য জন্য তাকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব “বীরশ্রেষ্ঠ” প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৪ সালে পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলস কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ। বাংলাদেশ রাইফেলস ১৯৭৩ সালে সিপাহি মুন্সি আব্দুর রউফকে অনরারি ল্যান্স নায়েক পদে মরণোত্তর পদোন্নতি প্রদান করে।

১৯৪৩ সালের ৮ মে, ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানার সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই বীর সন্তান। মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৬৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে যোগ দেন। ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটির মহালছড়ি থানার বুড়িঘাট চিংড়ি খাল এলাকায় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ শহীদ হন। শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ার চরে অবস্থিত।

৭। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ

নূর মোহাম্মদ শেখ (ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৩৬ – সেপ্টেম্বর ৫, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভ‚ষিত করা হয় তিনিও তাদের মধ্যে একজন।

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার চন্ডীকপুরের মহেষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারান ফলে শৈশবেই ডানপিটে হয়ে পড়েন। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করেননি।

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমাস্তে চাকরি করে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৭১ সালে ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে। সমানে গুলি ছুঁড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। একদিকে পাকিস্তানী সশস্ত্রবাহিনী, সঙ্গে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে মাত্র অর্ধমৃত সৈনিক (ইপিআর) সম্বল একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রু পক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই বীরসেনাকে পরবর্তীতে যশোর জেলার শার্শা উপজেলাস্থ ডিহি ইউনিয়ন কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ শুধুমাত্র ৭ জনের জীবন পরিচিত একসাথে করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া ও কিছু তথ্য মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

Share This Article
I am Sharif Khan